পাটবীজে আমদানি নির্ভরতা কমানো, বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে অর্থনীতিতে এর অবদান বাড়াতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা উন্নয়নে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। এর সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. জাহিদ হোসেন জানান, প্রকল্পগুলোর প্রস্তাব সম্প্রতি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সোনালি আঁশের দেশ হলেও দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি পাটবীজ আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো সমস্যা তৈরি হলে বীজ সরবরাহে ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এ নির্ভরতা কমাতেই দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি আয় ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বার্ষিক আয় ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায় সরকার। এ জন্য কাঁচা পাটের উৎপাদন ১ কোটি ১৫ লাখ বেল থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ বেল করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি দেশের চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পাটবীজ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাট রপ্তানি আয় কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১১৬ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ৮৮ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
কর্মকর্তাদের মতে, মূল্য সংযোজিত পণ্যের সীমিত উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া দেশের ২৬৬টি পাটকলের মধ্যে ৭৩টি বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগারের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ।
১২ প্রকল্পে প্রযুক্তি ও উৎপাদনে গুরুত্ব
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে পাটবীজ উৎপাদন ও বিতরণে ৩০০ কোটি টাকা এবং আধুনিক পাট কাটার ও আঁশ ছাড়ানোর যন্ত্রপাতি কেনায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। উৎপাদনশীলতা ও আঁশের মান বাড়াতে গবেষণায় ১২০ কোটি এবং ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরিতে ১৫০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব পাট পচানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ৫০ কোটি, লবণাক্ত ও পাহাড়ি জমিতে চাষ সম্প্রসারণে ১০০ কোটি এবং রাজশাহী ও রংপুরে রপ্তানিমুখী বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাটখড়ি থেকে চারকোল ও অ্যাকটিভেটেড কার্বন উৎপাদনে ১২০ কোটি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার স্থাপনে ২৮০ কোটি এবং কাঁচা পাটের মূল্য ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজার সম্প্রসারণেও নজর দেওয়ার পরামর্শ
পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তবে তাঁর মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বাজার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কার্যকর না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বাড়ছে না। আইন অনুযায়ী, ২১টি পণ্য পাটের বস্তায় মোড়কজাত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখনো ব্যাপকভাবে প্লাস্টিকের মোড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্কও বাংলাদেশের রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশ এখনো মূলত কাঁচা পাট রপ্তানি করছে। অন্যদিকে ভারত পাট প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করে বেশি মুনাফা অর্জন করছে। বাংলাদেশেরও বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তাঁর মতে, প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণে বাস্তব চাহিদা ও সরকারের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বাধা দূর করা এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে পারলেই পাটশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















