কৃষি মানেই কেবল মাঠে ঘাম ঝরানো কিংবা জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম—এমন প্রচলিত ধারণা বদলে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করেছেন ভুটানের দুই তরুণী। টিকটক ও ইউটিউবে নিজেদের দৈনন্দিন কৃষিকাজের ভিডিও প্রকাশ করে তারা তরুণ প্রজন্মের কাছে কৃষিকে আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের পরিচিতি এখন ‘ফার্মফ্লুয়েন্সার’ বা কৃষি প্রভাবক হিসেবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি তাদের এই প্রচেষ্টা ভুটানের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।
রোববার (১ নভেম্বর) নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম ভুটানের পারো উপত্যকার ২৫ বছর বয়সী কৃষক সোনাম জাম পপ নিয়মিত নিজের কৃষিকাজের ভিডিও প্রকাশ করেন টিকটকে। জমিতে বীজ বোনা থেকে শুরু করে আলু তোলা—খামারের প্রায় প্রতিটি কাজই উঠে আসে তার ভিডিওতে। এসব ভিডিও হাজার হাজার মানুষ দেখেন। ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত তার ইউটিউব চ্যানেল ‘সোনামস ভিলেজ ডায়েরি’র গ্রাহকসংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০।
সোনামের লক্ষ্য শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন নয়। তিনি চান, তরুণেরা কৃষিকে জীবিকার পাশাপাশি সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবেও বিবেচনা করুক। তার মতে, অনেক তরুণ কৃষিকে এখনো আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্র মনে করেন না। সেই ধারণা বদলাতেই তিনি ভিডিও প্রকাশ শুরু করেছেন। দর্শকদের ইতিবাচক মন্তব্য তাকে আরও উৎসাহিত করছে।
একই পথে এগোচ্ছেন পশ্চিম ভুটানের বাজো এলাকার ২৮ বছর বয়সী পাসাং ওম। পরিবারের হোমস্টে ব্যবসার প্রচারের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও ধীরে ধীরে তার ভিডিওতে গুরুত্ব পেয়েছে কৃষি ও গ্রামীণ জীবন। টিকটকে তার অনুসারী ২০ হাজারের বেশি এবং ইউটিউবে গ্রাহক প্রায় ১ হাজার ৭৭০। সরিষা শাক রোপণ, ধানখেতে ঘাস পরিষ্কার কিংবা গ্রীষ্মকালীন সবজিতে পানি দেওয়ার মতো সাধারণ কৃষিকাজের ভিডিওই তার জনপ্রিয় কনটেন্ট।
ভুটানের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব যথেষ্ট। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৫ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। কিন্তু উন্নত জীবিকা ও কর্মসংস্থানের আশায় তরুণদের গ্রাম ছেড়ে শহর কিংবা বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে গ্রামীণ জনপদে কৃষিশ্রমিকের সংকট তৈরি হচ্ছে। পাসাংয়ের ভাষ্য, তার গ্রামে এখন সমবয়সী আর কেউ অবশিষ্ট নেই।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৫ সালে তরুণদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রাম থেকে মানুষের চলে যাওয়া ঠেকাতে কৌশল গ্রহণ করে ভুটান সরকার। দেশটির কৃষি বিপণন ও সমবায় বিভাগের পরিচালক তাশি দর্জির মতে, কৃষিতে বিদেশি বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য উৎপাদনের নতুন উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে।
সম্প্রতি পারোতে খাদ্যব্যবস্থা বিষয়ক এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগেও বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, শুধু কৃষির গুরুত্ব বোঝালেই তরুণেরা এ পেশায় আসবে না। তাদের সামনে কৃষিতে সম্ভাবনা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ তুলে ধরতে হবে।
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ভুটানের কৃষি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোনাম তাশিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণীদের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এসব ভিডিও কৃষি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সোনাম জাম পপের কৃষিতে যুক্ত হওয়ার গল্পটিও কিছুটা ভিন্ন। শুরুতে পারিবারিক দায়িত্বের কারণেই তাকে কৃষিকাজে যুক্ত হতে হয়েছিল। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র মেয়ে হওয়ায় বয়স্ক মা-বাবার দেখাশোনা এবং পারিবারিক খামারের দায়িত্ব তার ওপর পড়ে। তবে সময়ের সঙ্গে কৃষির প্রতি তার ভালোবাসা তৈরি হয়। এখন কৃষিকেই নিজের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছেন তিনি।
সোনামের মতে, কৃষি কেবল বেঁচে থাকার উপায় নয়; এখানে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, পাসাংয়ের হোমস্টেতে আশপাশের জমিতে উৎপাদিত খাবার দিয়ে পর্যটকদের স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার স্বাদ দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভিডিও দেখে বিভিন্ন পর্যটন সংস্থাও তার সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
দুই তরুণীর উদ্যোগে কৃষি ও পর্যটনের মধ্যে নতুন সংযোগও তৈরি হচ্ছে। তাদের ভিডিওতে একদিকে যেমন কৃষিকাজের বাস্তব চিত্র উঠে আসছে, অন্যদিকে ভুটানের গ্রামীণ জীবন, স্থানীয় খাদ্য ও সংস্কৃতিও আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে পরিচিত হচ্ছে।
সোনামের বিশ্বাস, তরুণেরা উদ্যোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কৃষিতে এগিয়ে এলে এ খাত আরও লাভজনক ও টেকসই হয়ে উঠবে। কৃষির জীবনমুখী শিক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কৃষি একজন শিক্ষকের মতো। এটি মানুষকে ধৈর্যশীল, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষম এবং স্বনির্ভর হতে শেখায়।’
ভুটানের এই দুই তরুণীর উদ্যোগ তাই কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের গল্প নয়; বরং কৃষিকে নতুনভাবে ভাবার একটি প্রয়াস। প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা মানসিকতা ও সৃজনশীল প্রচারের সমন্বয়ে কৃষিকে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার এই মডেল গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আশার সৃষ্টি করছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















