শ্রম আইনে নির্ধারিত সুবিধার বাইরেও শ্রমিকদের বিভিন্ন বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য পরিচিত গাজীপুরের বেশ কয়েকটি বড় তৈরি পোশাক কারখানায় গত দুই দিনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে আরও ভাঙচুর ও লুটপাটের আশঙ্কায় এসব কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে মালিকপক্ষ।
মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। কারখানা মালিকদের অভিযোগ, এ আন্দোলনের মধ্যে এসব হামলার বেশিরভাগই করেছে বহিরাগত, বা অন্য কারখানার শ্রমিক বা শ্রমিক নামধারীরা।
মালিকরা বলেন, নিজেদের কারখানায় হামলার সময় তারা অসহায় বোধ করেছেন। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা পালনে অনাগ্রহ দেখা গেছে।
হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম চন্দ্রার ইকোটেক্স লিমিটেড। শ্রমিকদেরকে বিভিন্ন বাড়তি ভাতা ও সুবিধা দেওয়ার কারণে পরিচিত কারখানাটিতে শনিবার হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা কারখানার গেট ভাঙচুর করে।
প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, হামলার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করে। ফের হামলা ও লুটপাটের আশঙ্কায় প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কর্মীর কারখানাটি গতকালও বন্ধ ছিল।
কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড মেনে চলার জন্য পরিচিত ওই এলাকার আরেক বড় কারখানা নিট এশিয়াতেও গতকাল হামলা হয়েছে। এর ফলে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
মালিকদের তথ্যমতে, অন্তত ২০টি বড় ও মাঝারি আকারের কারখানায় হামলা চালানো হয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই উন্নত কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য সুপরিচিত।
হামলার শিকার কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে মণ্ডল গ্রুপ, ফার ইস্ট, ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস, পূর্বাণী গ্রুপ ও শারমিন গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং এআর জিন্স প্রডিউসার লিমিটেড ও যমুনা ডেনিমসের কারখানা।
কয়েকটি কারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় মোতায়েন করা নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন।
ইকোটেক্সের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তারা শ্রমিকদের বিনামূল্যে দুপুর ও রাতের খাবার এবং মাসে দুই দিন গরুর মাংস দিয়ে থাকেন। এছাড়া শ্রমিক, তাদের স্বামী বা স্ত্রী, দুই সন্তান ও মা-বাবার জন্য স্বাস্থ্যবিমার সুবিধাও দেওয়া হয়।
অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, সকালে আগে আসা কর্মীদের জন্য নাশতা, ২০০ টাকা আচরণ বোনাস, মাসিক ৫৫০ টাকা হাজিরা বোনাস ও অন্য প্রণোদনা।
তিনি আরও জানান, বেতন ও অন্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে কারখানাটি প্রতি মাসে একজন শ্রমিকের পেছনে গড়ে ২২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় করে। ফলে কর্মীরা সরকারিভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে বেশি আয় করার সুযোগ পান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, হামলাকারীদের কেউ কেউ ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় গর্ব করে ফেসবুকে ভাঙচুরের ছবিও শেয়ার করেছে। আক্ষেপ করে তিনি প্রশ্ন করেন, কিন্তু আমাদের অপরাধ কী?
তিনি বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ এখন অসহায় বোধ করছে। অথচ এই কারখানার কার্যক্রম ও সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নির্ভরশীল।
ইকোটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল হাসান বলেন, অতীতের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ মজুরি বোর্ডের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে এই সংকটের সমাধান করতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা সব জটিলতা কাটিয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ থাকলে খুব কষ্ট করে হলেও তা সামলে নেওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমরা ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি সময় চাইতে পারি এবং চড়া এয়ার ফ্রেইট চার্জ দিয়ে পণ্য পাঠাতে পারি।
শফিকুল বলেন, উৎপাদনকারীরা আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন, যা কারখানার কর্মসক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ‘যেকোনো অচলাবস্থা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। এতে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষ চাকরি হারাবে।’
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত দেশের ৪ কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখছে।
শফিকুল আরও বলেন, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে থেকেই উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















