বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে জাপান শুধু একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ নয়, বরং দেশের অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কয়েক দশক ধরে ঋণ, অনুদান, কারিগরি সহযোগিতা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রেখে চলেছে দেশটি। পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার এই দেশে জাপানের সহযোগিতার ছাপ রয়েছে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থা থেকে শুরু করে বন্দর, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত।
এই সম্পর্কের বিশেষত্ব হলো, সহায়তার ধরন সময়ের সঙ্গে বদলেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের প্রয়োজন থেকে শুরু করে আজকের বৃহৎ অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির পথে—বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অংশীদারত্ব বিস্তৃত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।
স্বাধীনতার পর থেকেই সহযোগিতার সূচনা
বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার সময় থেকেই জাপান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর বাংলাদেশে জাইকার কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জাপানের উন্নয়ন ঋণ সহযোগিতাও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে জাপানের সহায়তা বিস্তৃত হয়েছে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, সড়ক, রেলপথ, বন্দর ও নগর উন্নয়নসহ অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে।
বাংলাদেশের টোকিও দূতাবাসের ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশকে প্রায় ৩৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ, অনুদান, খাদ্যসহায়তা, পণ্য সহায়তা ও কারিগরি সহযোগিতা। প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ আর বাস্তবে ছাড় করা অর্থ এক নয়—তাই এ পরিসংখ্যানকে সহায়তার প্রতিশ্রুতির হিসাব হিসেবে দেখা জরুরি।
মেগা প্রকল্পে জাপানের বড় ভূমিকা
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নযাত্রায় জাপানের সবচেয়ে দৃশ্যমান অবদানগুলোর একটি হলো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন।
ঢাকা মেট্রোরেল: রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করেছে মেট্রোরেল। এর এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণে জাইকা বড় অঙ্কের ঋণসহায়তা দিয়েছে। যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় বাঁচানো এবং নগর অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেলের পাশাপাশি এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর মতো প্রকল্পেও জাপানের অর্থায়ন রয়েছে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর: কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন বাংলাদেশের জ্বালানি ও সমুদ্রবাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ। গভীর সমুদ্রবন্দরটি কার্যকরভাবে গড়ে উঠলে বড় জাহাজে পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের দক্ষতার ওপর।
যমুনা রেলসেতু: দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে যমুনা রেলসেতু গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্পেও জাপানের ঋণসহায়তা রয়েছে। রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বাড়লে পরিবহন ব্যয় কমানো এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল সম্প্রসারণ প্রকল্পেও জাপানের অর্থায়ন রয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এ প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে।
শুধু অবকাঠামো নয়, অর্থনীতির ভিতেও সহযোগিতা
জাপানের সহযোগিতা বড় প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও দেশটি সহায়তা করে আসছে।
কারিগরি সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ, জাপানে উচ্চশিক্ষার বৃত্তি, বিশেষজ্ঞ পাঠানো এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য শুধু প্রকল্প নির্মাণ নয়, বরং দেশের নিজস্ব দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো।
বেসরকারি বিনিয়োগেও জাপানের আগ্রহ বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলটি জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। এর সফলতা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।
সংকটের সময়ও পাশে জাপান
করোনাভাইরাস মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায়ও জাপান বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশের টোকিও দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০, ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে দেওয়া এ ধরনের ঋণসহায়তার মোট প্রতিশ্রুতি প্রায় ১ দশমিক ৩১৫ বিলিয়ন ডলার। এর উদ্দেশ্য ছিল সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করা।
২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হওয়াও সহযোগিতার নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়। অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক যোগাযোগে দুই দেশের স্বার্থ এখন আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
নতুন বাস্তবতা: সহায়তার পাশাপাশি হিসাব-নিকাশ
জাপানের অর্থায়ন দীর্ঘদিন তুলনামূলক সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের সুদ বেড়েছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাইকার ঋণের সুদের হার বাড়ায় বাংলাদেশ নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রকল্প বাছাই, ঋণের শর্ত এবং বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয়—সবকিছু আরও সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এখানেই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি সহায়তা উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হলেও তা যেন অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা অতিরিক্ত ঋণের বোঝা তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল যাচাই অপরিহার্য।
বন্ধুত্বের পরবর্তী অধ্যায়
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ইতিহাস আসলে একটি দেশের পুনর্গঠন থেকে আধুনিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। সেতু, রেলপথ, মেট্রোরেল, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দৃশ্যমান স্থাপনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতাও এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখন প্রয়োজন সহায়তাকে আরও বেশি উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত করা। জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি দক্ষতা ও নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে এই অংশীদারত্ব ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে।
পাঁচ দশকের বেশি সময়ের এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অর্জন তাই শুধু কত বিলিয়ন ডলার এসেছে, তা নয়; বরং সেই অর্থায়ন বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কতটা এগিয়ে নিতে পারল—তার মধ্যেই নিহিত থাকবে জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের প্রকৃত সাফল্য।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















