আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে শুধু জরিমানার মুখেই পড়তে হবে না, ব্যাহত হতে পারে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবাও। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অতিরিক্ত কর আরোপ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ রাষ্ট্রীয় পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কর ছাড়ের সুবিধা হারানো এবং বেতন-ভাতা পেতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা সোয়া এক কোটির বেশি। এর বিপরীতে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেন প্রায় ৫০ লাখ করদাতা। ফলে বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারী নিয়মিত রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। যদিও আইন অনুযায়ী, সব টিআইএনধারীর জন্য রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক নয়, তবে করযোগ্য আয় থাকলে এবং নির্ধারিত সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে রিটার্ন দিতে হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মতে, করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও অনেকে রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে আয়কর আইন অনুযায়ী, রিটার্ন না দেওয়ার কারণে কী ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, তা জানা জরুরি।
জরিমানা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা
নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে করদাতার সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। তবে জরিমানার পরিমাণ সর্বনিম্ন এক হাজার এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা হতে পারে। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত শর্তে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।
এ ছাড়া করসংক্রান্ত তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়ার পর তা দিতে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী জরিমানার মুখে পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট করদাতা।
হারাতে পারেন কর ছাড়ের সুবিধা
সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে বিভিন্ন বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত বা কর ছাড় পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। আয়কর আইনের ১৭৪ ধারায় নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী, বিলম্বে রিটার্ন জমা দেওয়ার কারণে করদাতাকে কর সুবিধা হারাতে হতে পারে।
সঞ্চয়পত্রসহ সরকার নির্ধারিত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে যাঁরা কর রেয়াতের সুবিধা নেন, তাঁদের জন্য নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সময়সীমা অতিক্রম করলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী করের হিসাব বদলে যেতে পারে।
বাড়তে পারে করের বোঝা
নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত করের দায় তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, বিলম্বের সময় ও করের হিসাব বিবেচনায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হতে পারে। ফলে সময়মতো রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে করদাতার মোট আর্থিক দায় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিচ্ছিন্ন হতে পারে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ
আয়কর রিটার্ন না দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণে বাধা। প্রযোজ্য আইনগত বিধান ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ রাষ্ট্রীয় পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, আয়কর-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত ও প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
বেতন-ভাতা পেতেও তৈরি হতে পারে জটিলতা
নির্দিষ্ট শ্রেণির সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীর জন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র চাইতে পারে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে ব্যর্থ হলে বেতন-ভাতা ছাড় বা অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পদ বা পেশার ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার প্রমাণ বাধ্যতামূলক, সেসব ক্ষেত্রে করদাতাদের সময়সীমার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কখন রিটার্ন জমা দেবেন
চলতি অর্থবছরে রিটার্ন জমার সময়সীমা ও বিলম্বজনিত করের হিসাব নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী অনুসরণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা প্রযোজ্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলে অতিরিক্ত কর বা জরিমানার দায় তৈরি হতে পারে।
তাই করযোগ্য আয় থাকলে এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক হলে শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে রিটার্ন জমা দেওয়া উচিত। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত জরিমানা, কর ছাড় হারানো এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণে জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















