একসময় আশ্বিন-কার্তিক মাস এলেই উত্তরাঞ্চলের অনেক পরিবারে দেখা দিত খাদ্যসংকট। কৃষিকাজের অভাবে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রংপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে পরিচিত ছিল ‘মঙ্গা’ নামের দুর্ভোগ। সেই পরিস্থিতি বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত। আগাম ধান কাটার ফলে কৃষক যেমন বাড়তি ফসল ফলানোর সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে আয় ও কর্মসংস্থান।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত এসব জাতের ধান প্রচলিত জাতের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন আগে পাকে। ফলে একই জমিতে বছরে তিনটি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
কম সময়ে বেশি ফলন
কৃষি কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত জাতের ধান পাকতে ১৩৬ থেকে ১৫৫ দিন লাগে। অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান ১০০ থেকে ১২০ দিনেই কাটা যায়। প্রচলিত জাতের হেক্টরপ্রতি ফলন ৪ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন হলেও স্বল্পমেয়াদি জাতের ফলন ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত হতে পারে।
চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলা—রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪২২ হেক্টরে চাষ হয়েছে স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান, যা মোট আমন জমির প্রায় ২৫ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে এ হার ছিল ২০ শতাংশ।
একই জমিতে বাড়তি ফসল
কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া গ্রামের কৃষক আহাদ আলী এ বছর নয় বিঘা জমির তিন বিঘায় আগাম আমন চাষ করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে ধান কাটার পর জমিতে ফুলকপি, টমেটো ও মরিচ চাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি।
আহাদ আলীর ভাষ্য, আগাম ধান কাটতে পারায় শীতকালীন সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে একই জমি থেকে অতিরিক্ত ফসল পাওয়া যাচ্ছে এবং বাড়ছে আয়।
লালমনিরহাটের কৃষক রঞ্জিত দেবনাথও আট বিঘা জমির দুই বিঘায় আগাম আমন চাষ করেছেন। গত বছর ওই জমিতে ফুলকপি চাষ করে তার লাভ হয়েছিল ৯০ হাজার টাকা। এ বছরও ভালো লাভের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
মঙ্গা মোকাবিলায় উদ্যোগ
মঙ্গা মোকাবিলায় ২০০৫ সালে ব্রি ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়। ব্রি ধান-৩৩-এর মাধ্যমে এ উদ্যোগ বিস্তৃত হতে থাকে। ২০১০ সালের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এসব জাতের চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রি কর্মকর্তাদের মতে, আগাম ধান কাটার ফলে জমি দ্রুত খালি হয়। সেখানে আলু, সরিষা, ডাল ও শীতকালীন সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হয়। এতে জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বাড়ে।
সব এলাকায় উপযোগী নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি ধান খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি ডাল ও সরিষার মতো ফসল চাষে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হতে পারে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
তবে সব অঞ্চলে এসব জাত সমান উপযোগী নয়। জমির ধরন, পানির স্তর ও আবহাওয়া বিবেচনায় জাত নির্বাচন জরুরি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত জাত ও পরিকল্পিত ফসলচক্র নিশ্চিত করা গেলে স্বল্পমেয়াদি ধান দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং মৌসুমি খাদ্যসংকট মোকাবিলায় আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















