মোবাইলের পর্দায় ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফির ছবি। ছবিটি দেখে কফি খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু দূরে বসে তার ঘ্রাণ নেওয়ার উপায় নেই। আবার বন্ধুর পাঠানো জন্মদিনের কেকের ছবি দেখে মনে হচ্ছে, আহা! যদি একবার সুবাসটা পাওয়া যেত! প্রযুক্তির নতুন এক উদ্ভাবন সেই অপূর্ণ ইচ্ছাকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। এবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে শুধু ছবি, শব্দ কিংবা ভিডিও নয়, নির্দিষ্ট কিছু গন্ধের তথ্যও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় গন্ধ শনাক্ত করে তা বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর এবং অন্য প্রান্তে সেই গন্ধ পুনরায় তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গবেষকেরা। ‘সেন্ট্রনিক’ নামের এই প্রযুক্তি দিয়ে আপাতত কমলা, কফি, কেক, বিয়ার ও রেড ওয়াইনের মতো পাঁচ ধরনের খাবার ও পানীয়ের গন্ধ শনাক্ত ও পুনরায় তৈরি করা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি আরও উন্নত হলে ডিজিটাল যোগাযোগে যুক্ত হতে পারে ঘ্রাণের নতুন অভিজ্ঞতা।
ধরা যাক, বিদেশে থাকা কোনো বন্ধু আপনাকে সদ্য তৈরি মাফিনের ছবি পাঠালেন। এত দিন সেই ছবি দেখে মাফিনের রং, আকৃতি ও পরিবেশনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত। কিন্তু তার মিষ্টি সুবাস অনুভব করার সুযোগ ছিল না। গন্ধ পাঠানোর প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে ছবির সঙ্গে সেই সুবাসের অভিজ্ঞতাও যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক চুনইয়ু ইয়াং ও তাঁর সহকর্মীরা এই সম্ভাবনা সামনে রেখেই তৈরি করেছেন সেন্ট্রনিক। প্রযুক্তিটির মূল লক্ষ্য হলো, কোনো গন্ধের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে ডিজিটাল সংকেতে রূপান্তর করা এবং সেই সংকেত ব্যবহার করে দূরবর্তী স্থানে একই ধরনের গন্ধ তৈরি করা।
তবে এখনই ইন্টারনেটে যেকোনো গন্ধ পাঠানো সম্ভব নয়। বর্তমানে প্রযুক্তিটি সীমিতসংখ্যক গন্ধ নিয়ে কাজ করছে। তারপরও ডিজিটাল জগতে ঘ্রাণ যুক্ত করার গবেষণাটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মানুষের নাক যেমন বিভিন্ন গন্ধের পার্থক্য বুঝতে পারে, সেন্ট্রনিকেও তেমন কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ইলেকট্রনিক নাক বা ‘ই-নোজ’। তবে এই নাক মানুষের মতো গন্ধ অনুভব করে না। এটি গন্ধের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক উপাদানের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে।
যন্ত্রটিতে রয়েছে ধাতব অক্সাইড দিয়ে তৈরি একাধিক সেন্সর। ইথানল কিংবা লেবুজাতীয় ফলের লিমোনিনের মতো গ্যাসীয় উপাদান সেন্সরের সংস্পর্শে এলে এর বৈদ্যুতিক রোধে পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গন্ধের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এরপর এআই অ্যালগরিদম সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে গন্ধ শনাক্ত করে। পাঁচ ধরনের খাবার ও পানীয়ের গন্ধ চেনাতে এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে গবেষকদের প্রতিটি গন্ধের সংস্পর্শে সেন্সরগুলোকে শত শতবার আনতে হয়েছে। গবেষক ইয়াংয়ের মতে, এআইকে নির্ভুলভাবে গন্ধ চেনানোই ছিল গবেষণার অন্যতম কঠিন কাজ।
গন্ধ শনাক্ত করার পর সেটির সংকেত ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠানো হয় অন্য প্রান্তের একটি বিশেষ যন্ত্রে। এই যন্ত্রে পাঁচ ধরনের সুগন্ধযুক্ত তরল রাখা ছোট পাত্র রয়েছে। সংকেত পাওয়ার পর বিশেষ অ্যাটোমাইজার তরলকে অতি সূক্ষ্ম কণায় পরিণত করে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় নির্দিষ্ট গন্ধ।
বিষয়টি অনেকটা ডিজিটাল মাধ্যমে শব্দ পাঠিয়ে অন্য প্রান্তে তা শোনার মতো। পার্থক্য হলো, শব্দের বদলে এখানে পাঠানো হচ্ছে গন্ধের বৈশিষ্ট্যসংবলিত সংকেত। আর সেই সংকেতের ভিত্তিতে যন্ত্রটি বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সুগন্ধ।
প্রযুক্তিটির হাতে বহনযোগ্য সংস্করণ ১৪ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় তাঁরা গড়ে ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক গন্ধ শনাক্ত করতে পেরেছেন। এই ফলাফল প্রাথমিকভাবে আশাব্যঞ্জক হলেও প্রযুক্তিটির নির্ভুলতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সেন্ট্রনিকের সম্ভাব্য ব্যবহারগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল বিনোদন ও ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি। বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল জগতে দৃশ্য ও শব্দের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে বাস্তবের কাছাকাছি অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর সঙ্গে গন্ধ যুক্ত করা গেলে সেই অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
যেমন, ভার্চ্যুয়াল বাগানে ফুল দেখার সময় ফুলের সুবাস অনুভব করা কিংবা ডিজিটাল রান্নার পরিবেশে খাবারের গন্ধ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অনলাইন বিপণন ও খাবারের প্রচারেও এমন প্রযুক্তি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এ ছাড়া মহাকাশচারী ও সেনাদের খাবারের অভিজ্ঞতা উন্নত করার সম্ভাবনাও দেখছেন গবেষকেরা। প্রতিকূল পরিবেশে খাবারের গন্ধের অনুভূতি উপভোগের সুযোগ তৈরি করা গেলে খাবার গ্রহণের অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয় হতে পারে।
ঘ্রাণশক্তির পরিবর্তন শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। ভাইরাস-পরবর্তী অসুস্থতা কিংবা স্নায়ুক্ষয়জনিত কিছু রোগের কারণে মানুষের ঘ্রাণশক্তিতে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। গন্ধ শনাক্ত করার প্রযুক্তি এসব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করতে আরও পরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।
প্রযুক্তিটি যতই আকর্ষণীয় হোক, গন্ধকে ডিজিটাল মাধ্যমে ধারণ ও পুনরায় তৈরির কাজ এখনো বেশ জটিল। কারণ, একটি খাবার বা ফুলের সুবাসে অনেক ধরনের রাসায়নিক উপাদান ভূমিকা রাখতে পারে। উপাদানগুলোর অনুপাত ও পরিবেশের পরিবর্তনে একই উৎসের গন্ধেও পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক মারিয়ানা ওব্রিস্টের মতে, উদ্যোগটি আশাব্যঞ্জক হলেও সীমিতসংখ্যক গন্ধ শনাক্ত করে তা পুনরায় তৈরি করা এখনো ছবি ও শব্দ আদান-প্রদানের মতো সহজ নয়। মানুষের ঘ্রাণের অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে ধারণ ও পুনরায় উপস্থাপনের জন্য প্রযুক্তিটিকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















