বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান। ত্রুটিগুলো প্রকাশ্যে আসার পরপরই সেগুলো কাজে লাগিয়ে সাইবার হামলার চেষ্টা বেড়েছে বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোথাও ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও দ্রুত সফটওয়্যার হালনাগাদ করে সেবা পুনরায় চালুর প্রস্তুতি চলছে।
জাপান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পর্যন্ত ব্যাংক, বিমান সংস্থা, রেল যোগাযোগ, কর বিভাগ এবং সরকারি অনলাইন সেবায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অবকাঠামোয় পিএইচপির ব্যাপক ব্যবহার এবং একটি নিরাপত্তা ত্রুটির প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তা সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জার্মানির কোলোনে এক অনুষ্ঠানে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সময়টি ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি দেখেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, নিরাপত্তা বজায় রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়—এমন ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে।
এআইয়ের সহায়তায় শনাক্ত ত্রুটি, দ্রুত সংশোধনী প্রকাশ
ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় ব্যবহৃত পিএইচপি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় এ ভাষার বহু পুরোনো নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করা হয়। পরে বুধবার পিএইচপির নির্মাতারা জরুরি নিরাপত্তা সংশোধনী প্রকাশ করে ব্যবহারকারীদের দ্রুত সফটওয়্যার হালনাগাদের পরামর্শ দেন।
তবে সংশোধনী প্রকাশের আগেই ত্রুটিগুলোর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসায় ঝুঁকি বেড়ে যায়। বেলজিয়ামভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আইকিডো সিকিউরিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ম্যাডেলিন লরেন্স বলেন, ত্রুটিগুলোর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাব্য হামলাকারীদের আগেই নিজেদের ব্যবস্থা হালনাগাদ করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু সংশোধনী ইনস্টল করাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশনের নিরাপত্তা পরীক্ষা, দুর্বলতা শনাক্ত এবং সেবা সচল রাখার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
কয়েক ঘণ্টায় বেড়েছে হামলার চেষ্টা
সাইবার নিরাপত্তা ও ক্লাউড সেবা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ার জানিয়েছে, পিএইচপির ত্রুটির তথ্য প্রকাশের পর সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা দ্রুত বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ম্যাথু প্রিন্স বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ত্রুটির তথ্য প্রকাশের আগের ১০ ঘণ্টায় তাদের নেটওয়ার্কে এটি কাজে লাগানোর হাজারো চেষ্টা শনাক্ত হয়েছিল। ঘোষণার পর প্রথম ৪৫ মিনিটেই সেই সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছায়। পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রচেষ্টার সংখ্যা কয়েক লাখে উন্নীত হয় বলে তিনি জানান।
এই তথ্য বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তাৎক্ষণিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে শনাক্ত হওয়া হামলার প্রচেষ্টা আর সফল সাইবার হামলার ঘটনা এক নয়। কতগুলো প্রচেষ্টা সফল হয়েছে, সে বিষয়ে সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়নি।
জাপানে ব্যাংক, বিমান ও রেলসেবায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা
পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি মোকাবিলায় জাপানের একাধিক প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে অনলাইন সেবা বন্ধ রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান নোমুরা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি ইউএফজে ফাইন্যানশিয়াল গ্রুপ, বিমান সংস্থা এএনএ এবং ইস্ট জাপান রেলওয়ে। বিমা প্রতিষ্ঠান টোকিও মেরিন হোল্ডিংসও তাদের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে।
দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া সংস্থা এবং জাতীয় কর সংস্থাও নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করে। সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলো পরীক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর সেবা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ট্রেন্ডএআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই জাপানে গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় বেশি সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন নিরাপত্তা ত্রুটি দেশটির ডিজিটাল সেবাগুলোর সুরক্ষাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















