উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাজস্ব ও আর্থিক খাতে কার্যকর সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা কাটাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সেপ্টেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে পড়তে পারে দেশ।
বাংলাদেশ ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। গত জুনে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে এ হার ১০ শতাংশের বেশি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি উঁচু অবস্থানে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
দুর্বল আর্থিক খাতে সংস্কারের তাগিদ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এ খাতকে শক্তিশালী করতে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে তারা।
রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শ
বাংলাদেশের কম রাজস্ব আদায় নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় দেশের রাজস্ব আয়ের অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি।
সংস্থাটির মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থ জোগানো এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া সরকারের উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের অর্থ ছাড় না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ সরকার সংস্থাটির সহায়তায় নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। এর ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বিভিন্ন সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আইএমএফের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংস্থাটি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতেও আইএমএফ আগ্রহী।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















