০১:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

সৌদির সংঘাতে তিনমুখী ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: রেমিট্যান্স, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি

The gallery was not found!

সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশির নিরাপত্তা, প্রবাসী আয় এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ—সবই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ সৌদি আরব থেকে আমদানি হওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রভাবের তথ্য না থাকলেও পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী কর্মী ও যাত্রীদের যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রবাসীদের আয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স নিয়েও নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রেমিট্যান্সে বড় অবদান সৌদির

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান বলছে, সৌদি আরবে কর্মসংস্থান ও আয় ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু প্রবাসী পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের যেসব পরিবার প্রবাসী স্বজনের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল, তাদের দৈনন্দিন ব্যয়, ঋণের কিস্তি ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ফ্লাইট বন্ধ, চাপে কর্মীরা

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধের কারণে সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশের ২২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইটসহ মোট ৬১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অন্তত ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিতভাবে চালু রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে যেসব কর্মীর নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তারা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের ফলে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ, টিকিট পুনরায় কেনা এবং যাত্রা-সংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয় নিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার জন্য ধারদেনা করা কর্মীদের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। শুধু সেপ্টেম্বরেই দেশটি ৩২ হাজার ৯১৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রা এবং বিদ্যমান কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

জ্বালানি আমদানিতেও ঝুঁকি

বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। ফলে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন বা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে সরবরাহে বিঘ্ন, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আমদানি ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জ্বালানি পরিবহনের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।

প্রবাসীদের নিরাপত্তা এখন অগ্রাধিকার

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সৌদিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমতে পারে এবং একপর্যায়ে কিছু প্রবাসীকে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। তাঁর মতে, এ মুহূর্তে সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সরকার বিদেশে কর্মসংস্থানের বিকল্প বাজার খোঁজার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে।

এদিকে, রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা প্রথমে আশঙ্কাজনক হলেও পরে চারজন ঝুঁকিমুক্ত হন। ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে যাওয়া সাফাত রহমান তখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর আরও ১২ জনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দূতাবাস প্রবাসীদের সতর্ক থাকতে, ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে বলেছে। সংঘাতের ছবি, ভিডিও বা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ ও আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও দেশটির আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও বিকল্প প্রস্তুতি জরুরি

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীরের মতে, গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন এড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য কঠিন কূটনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—প্রবাসীদের নিরাপত্তা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দেশে ফেরা কর্মীদের দক্ষতা অনুযায়ী পুনর্বাসন, জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প প্রস্তুতি এবং প্রবাসীদের জন্য জরুরি সহায়তা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তাই সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রভাব সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও জরুরি। কারণ, বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারের আয় কমে যাওয়া নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

সৌদির সংঘাতে তিনমুখী ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: রেমিট্যান্স, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি

Update Time : ০৮:৪৫:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশির নিরাপত্তা, প্রবাসী আয় এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ—সবই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ সৌদি আরব থেকে আমদানি হওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রভাবের তথ্য না থাকলেও পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী কর্মী ও যাত্রীদের যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রবাসীদের আয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স নিয়েও নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রেমিট্যান্সে বড় অবদান সৌদির

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান বলছে, সৌদি আরবে কর্মসংস্থান ও আয় ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু প্রবাসী পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের যেসব পরিবার প্রবাসী স্বজনের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল, তাদের দৈনন্দিন ব্যয়, ঋণের কিস্তি ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ফ্লাইট বন্ধ, চাপে কর্মীরা

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধের কারণে সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশের ২২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইটসহ মোট ৬১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অন্তত ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিতভাবে চালু রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে যেসব কর্মীর নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তারা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের ফলে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ, টিকিট পুনরায় কেনা এবং যাত্রা-সংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয় নিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার জন্য ধারদেনা করা কর্মীদের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। শুধু সেপ্টেম্বরেই দেশটি ৩২ হাজার ৯১৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রা এবং বিদ্যমান কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

জ্বালানি আমদানিতেও ঝুঁকি

বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। ফলে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন বা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে সরবরাহে বিঘ্ন, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আমদানি ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জ্বালানি পরিবহনের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।

প্রবাসীদের নিরাপত্তা এখন অগ্রাধিকার

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সৌদিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমতে পারে এবং একপর্যায়ে কিছু প্রবাসীকে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। তাঁর মতে, এ মুহূর্তে সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সরকার বিদেশে কর্মসংস্থানের বিকল্প বাজার খোঁজার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে।

এদিকে, রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা প্রথমে আশঙ্কাজনক হলেও পরে চারজন ঝুঁকিমুক্ত হন। ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে যাওয়া সাফাত রহমান তখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর আরও ১২ জনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দূতাবাস প্রবাসীদের সতর্ক থাকতে, ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে বলেছে। সংঘাতের ছবি, ভিডিও বা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ ও আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও দেশটির আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও বিকল্প প্রস্তুতি জরুরি

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীরের মতে, গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন এড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য কঠিন কূটনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—প্রবাসীদের নিরাপত্তা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দেশে ফেরা কর্মীদের দক্ষতা অনুযায়ী পুনর্বাসন, জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প প্রস্তুতি এবং প্রবাসীদের জন্য জরুরি সহায়তা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তাই সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রভাব সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও জরুরি। কারণ, বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারের আয় কমে যাওয়া নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।