০১:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

আমানত ফেরাতে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকের

The gallery was not found!

গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাওয়া ন্যাশনাল ব্যাংককে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টিতে ১০ শতাংশ সুদে তিন মাসের জন্য দেওয়া এই অর্থে আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকটি। এতে আমানতকারীদের চাহিদামতো টাকা তোলার সুযোগ তৈরি হলেও ব্যাংকটির বিপুল খেলাপি ঋণ, দীর্ঘদিনের লোকসান ও মূলধনসংকট কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকেরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছিলেন না। এ নিয়ে চার আমানতকারী আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলে বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপর ব্যাংকটির লেনদেন স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নেয় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ওই বৈঠকে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ করে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে অর্থ ধার দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থ পরিশোধ করবে। ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ঋণের মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে সোনালী ব্যাংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি কমলেও শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের দায় ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপরই থাকছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা

ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্যসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবার সরাসরি নতুন টাকা সরবরাহ না করে গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থের ব্যবস্থা করেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নতুন টাকা সৃষ্টি এড়ানোর লক্ষ্যেই এ পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দায় মেটাতে হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত দায় আরও বেড়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ব্যাংকটির পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এর পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন টাকা সৃষ্টির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অনিয়মের ধাক্কা কাটেনি

ন্যাশনাল ব্যাংকের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, ঋণ বিতরণে দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের বড় বোঝাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে গ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। বর্তমানে মাল্টিমোড, হোসাফ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।

তবে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এলেও আর্থিক সংকট কাটেনি। ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর লোকসান করছে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ খেলাপি। এর পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি লোকসান করেছে ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।

সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান কত দূর

সোনালী ব্যাংকের দেওয়া সাত হাজার কোটি টাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের তাৎক্ষণিক তারল্যসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে। এতে গ্রাহকদের টাকা তোলার চাপ সামলানো এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ অর্থ নতুন আমানত বা আয় নয়; এটি সুদসহ ফেরত দিতে হবে।

তাই শুধু ধার করা অর্থ দিয়ে সাময়িকভাবে লেনদেন স্বাভাবিক করা গেলেও ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানে খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি। সাত হাজার কোটি টাকার এই সহায়তা ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য আপাতত স্বস্তি আনলেও ব্যাংকটি আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতার ওপর।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

আমানত ফেরাতে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকের

Update Time : ০৮:২৫:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাওয়া ন্যাশনাল ব্যাংককে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টিতে ১০ শতাংশ সুদে তিন মাসের জন্য দেওয়া এই অর্থে আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকটি। এতে আমানতকারীদের চাহিদামতো টাকা তোলার সুযোগ তৈরি হলেও ব্যাংকটির বিপুল খেলাপি ঋণ, দীর্ঘদিনের লোকসান ও মূলধনসংকট কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকেরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছিলেন না। এ নিয়ে চার আমানতকারী আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলে বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপর ব্যাংকটির লেনদেন স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নেয় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ওই বৈঠকে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ করে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে অর্থ ধার দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থ পরিশোধ করবে। ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ঋণের মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে সোনালী ব্যাংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি কমলেও শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের দায় ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপরই থাকছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা

ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্যসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবার সরাসরি নতুন টাকা সরবরাহ না করে গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থের ব্যবস্থা করেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নতুন টাকা সৃষ্টি এড়ানোর লক্ষ্যেই এ পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দায় মেটাতে হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত দায় আরও বেড়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ব্যাংকটির পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এর পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন টাকা সৃষ্টির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অনিয়মের ধাক্কা কাটেনি

ন্যাশনাল ব্যাংকের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, ঋণ বিতরণে দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের বড় বোঝাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে গ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। বর্তমানে মাল্টিমোড, হোসাফ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।

তবে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এলেও আর্থিক সংকট কাটেনি। ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর লোকসান করছে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ খেলাপি। এর পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি লোকসান করেছে ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।

সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান কত দূর

সোনালী ব্যাংকের দেওয়া সাত হাজার কোটি টাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের তাৎক্ষণিক তারল্যসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে। এতে গ্রাহকদের টাকা তোলার চাপ সামলানো এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ অর্থ নতুন আমানত বা আয় নয়; এটি সুদসহ ফেরত দিতে হবে।

তাই শুধু ধার করা অর্থ দিয়ে সাময়িকভাবে লেনদেন স্বাভাবিক করা গেলেও ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানে খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি। সাত হাজার কোটি টাকার এই সহায়তা ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য আপাতত স্বস্তি আনলেও ব্যাংকটি আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতার ওপর।