০১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ৫৯ ও ৬০ ধারা অবহেলায় বড় বিপদ!

The gallery was not found!

এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দেনা ‘শরীয়াহভিত্তিক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-র কাছে হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা থাকলেও এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলনামূলকভাবে আড়ালে—সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান পরিচালক, নির্বাহী ও কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য ব্যক্তিগত আইনগত দায়।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ৫৯ ও ৬০ ধারার বিধান এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের সম্পদ, রেকর্ড, হিসাব, দলিলপত্র বা লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্ন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে আইনে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দায়িত্বে থাকার সময় কোনো অনিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অবগত ছিলেন কি না—শুধু সেই প্রশ্নই শেষ কথা নয়। নিজের দায়িত্বের আওতায় যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল কি না, নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না এবং কোনো অনিয়ম চোখে পড়ার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ, আজ যে সিদ্ধান্তকে একজন কর্মকর্তা কেবল দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন, রেজল্যুশন বা অবসায়নের প্রক্রিয়ায় সেটিই কাল তার ব্যক্তিগত আইনি জবাবদিহির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই আইনের কঠোর বিধানগুলো শুধু আইনজীবী বা ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জানার বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মকর্তা ও পরিচালকের জন্যই এগুলো অনুধাবন করা জরুরি।

৫৯ ধারায় কী বলা হয়েছে

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ৫৯(১)(গ)-এর উপদফা (অ), (ই), (ঈ), (উ) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপদফায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯(১)(গ)(অ) ও (ই)-এর বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে, অস্থায়ী প্রশাসন ও রেজল্যুশনের আওতাধীন অথবা অবসায়নাধীন কোনো তফসিলি ব্যাংকের পরিচালক বা কর্মকর্তা যদি ওই ব্যাংকের সম্পত্তি বা বিষয়-সম্পর্কিত কোনো বহি, রেজিস্টার, রেকর্ড বা দলিলপত্র গোপন, ধ্বংস, বিকৃত বা জাল করেন অথবা তাতে সহযোগিতা করেন, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এ ধরনের বিধান ব্যাংকের রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় নথিপত্র ও সম্পদের সঠিকতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দেনা যখন নতুন প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট সম্পদ, দায়, হিসাব ও নথিপত্রের যথার্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কোথায় তৈরি হতে পারে ব্যক্তিগত ঝুঁকি 

অনেক কর্মকর্তা হয়তো মনে করতে পারেন, কোনো অনিয়মে তিনি সরাসরি যুক্ত না থাকলে তার ব্যক্তিগত দায় তৈরি হবে না। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, কর্মকর্তা বা সচিবের দায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু ‘আমি জানতাম না’—এই বক্তব্য সব পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেখাতে হতে পারে যে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

১২ মাসের লেনদেন ও হিসাব

রেজল্যুশন বা অবসায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাব-নিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের সম্পত্তি, ঋণ, হিসাব বা সংশ্লিষ্ট নথিতে কোনো পরিবর্তন বা অসঙ্গতি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কোনো নথিপত্র পরিবর্তন করা, তথ্য গোপন করা, ভুয়া বা অস্পষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা কিংবা সম্পদের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার মতো ঘটনা সামনে এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডও প্রশ্নের মুখে আসতে পারে

গত পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংকের কোনো পাওনাদারের সঙ্গে দেনদরবার, ক্ষতি বা ব্যয়ের হিসাব কিংবা আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো ক্ষতির হিসাব ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেখানো, কল্পিত ক্ষতির তথ্য উপস্থাপন বা কোনো আর্থিক লেনদেনকে ভিন্নভাবে দেখানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণা বা অন্যান্য অপরাধের প্রশ্ন উঠতে পারে।

অন্যের কর্মকাণ্ডেও দায়ের ঝুঁকি

ব্যাংকের কোনো সম্পত্তি অবৈধভাবে বন্ধক রাখা বা স্থানান্তরের ঘটনায় একজন কর্মকর্তা সরাসরি যুক্ত না থাকলেও তিনি বিষয়টি জানতেন কি না, দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। অর্থাৎ, অন্য কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজের দায়িত্বের সীমা ও ভূমিকা কতটা ছিল, সেটিও আইনি জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শাস্তির বিধান কতটা কঠোর

আইনের ৬৩ ধারায় ৫৯ ধারার আওতায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে। ধারা ৬৩(১)-এ বলা হয়েছে, এই আইনের ৫৯ ধারার উপধারা (১)-এর দফা (গ)-এর উপদফা (অ), (ই), (ঈ), (উ) এবং (ঘ), (চ), (ছ) ও (জ)-এর আওতায় কোনো অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ, আইনটির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডের বিধান থাকায় এর প্রভাব ব্যক্তির পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপরও পড়তে পারে।

ধারা ৬৩(২)-এ বলা হয়েছে, এ ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রশাসক, অবসায়ক বা রেজল্যুশনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি কিংবা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।

এখন করণীয় কী

আইনের কঠোর বিধান দেখে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচালকদের এখন থেকেই সতর্ক হওয়া বেশি জরুরি। দায়িত্ব পালনকালে নিজের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের একটি স্বচ্ছ ও যথাযথ রেকর্ড রাখা ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

১. সব নথিপত্র যাচাই করুন: নিজের অধীনে থাকা বা অতীতে তত্ত্বাবধান করা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ, রেজিস্টার, রেকর্ড ও দলিলপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো গরমিল, অসঙ্গতি বা তথ্যের ঘাটতি থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

২. কোনো তথ্য গোপন করবেন না: বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রশাসক বা অবসায়কের কোনো চাওয়া বা নির্দেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো তথ্য গোপন করা, নথি আটকে রাখা বা অযথা সময়ক্ষেপণ ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সময়মতো দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের রেকর্ড সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

৩. দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন: নিজের শাখা, দপ্তর বা কর্মপরিধিতে কোনো অনিয়ম, সন্দেহজনক লেনদেন বা ভুয়া তথ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা প্রয়োজন। সন্দেহজনক কোনো বিষয় নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে কোনো তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ পাবেন।

ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়-দেনা স্থানান্তরের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক তথ্য, নথিপত্র, সম্পদ, ঋণ ও অতীতের সিদ্ধান্তের হিসাব। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচালকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সতর্কতা, নথিপত্রে স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে যথাযথ আইনি সচেতনতা নিশ্চিত করা।

আজকের একটি অবহেলা বা অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। তাই আতঙ্কিত হয়ে নয়, বরং সময় থাকতে নিজের দায়িত্ব, নথিপত্র ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

দেশীয় ফ্যাশনে আস্থার প্রতীক ফিট এলিগ্যান্স, নেতৃত্বে সাফল্যের নতুন দিগন্ত

Business Times24

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ৫৯ ও ৬০ ধারা অবহেলায় বড় বিপদ!

Update Time : ০৫:২৫:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দেনা ‘শরীয়াহভিত্তিক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-র কাছে হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা থাকলেও এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলনামূলকভাবে আড়ালে—সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান পরিচালক, নির্বাহী ও কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য ব্যক্তিগত আইনগত দায়।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ৫৯ ও ৬০ ধারার বিধান এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের সম্পদ, রেকর্ড, হিসাব, দলিলপত্র বা লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্ন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে আইনে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দায়িত্বে থাকার সময় কোনো অনিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অবগত ছিলেন কি না—শুধু সেই প্রশ্নই শেষ কথা নয়। নিজের দায়িত্বের আওতায় যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল কি না, নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না এবং কোনো অনিয়ম চোখে পড়ার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ, আজ যে সিদ্ধান্তকে একজন কর্মকর্তা কেবল দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন, রেজল্যুশন বা অবসায়নের প্রক্রিয়ায় সেটিই কাল তার ব্যক্তিগত আইনি জবাবদিহির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই আইনের কঠোর বিধানগুলো শুধু আইনজীবী বা ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জানার বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মকর্তা ও পরিচালকের জন্যই এগুলো অনুধাবন করা জরুরি।

৫৯ ধারায় কী বলা হয়েছে

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ৫৯(১)(গ)-এর উপদফা (অ), (ই), (ঈ), (উ) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপদফায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯(১)(গ)(অ) ও (ই)-এর বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে, অস্থায়ী প্রশাসন ও রেজল্যুশনের আওতাধীন অথবা অবসায়নাধীন কোনো তফসিলি ব্যাংকের পরিচালক বা কর্মকর্তা যদি ওই ব্যাংকের সম্পত্তি বা বিষয়-সম্পর্কিত কোনো বহি, রেজিস্টার, রেকর্ড বা দলিলপত্র গোপন, ধ্বংস, বিকৃত বা জাল করেন অথবা তাতে সহযোগিতা করেন, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এ ধরনের বিধান ব্যাংকের রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় নথিপত্র ও সম্পদের সঠিকতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দেনা যখন নতুন প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট সম্পদ, দায়, হিসাব ও নথিপত্রের যথার্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কোথায় তৈরি হতে পারে ব্যক্তিগত ঝুঁকি 

অনেক কর্মকর্তা হয়তো মনে করতে পারেন, কোনো অনিয়মে তিনি সরাসরি যুক্ত না থাকলে তার ব্যক্তিগত দায় তৈরি হবে না। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, কর্মকর্তা বা সচিবের দায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু ‘আমি জানতাম না’—এই বক্তব্য সব পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেখাতে হতে পারে যে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

১২ মাসের লেনদেন ও হিসাব

রেজল্যুশন বা অবসায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাব-নিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের সম্পত্তি, ঋণ, হিসাব বা সংশ্লিষ্ট নথিতে কোনো পরিবর্তন বা অসঙ্গতি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কোনো নথিপত্র পরিবর্তন করা, তথ্য গোপন করা, ভুয়া বা অস্পষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা কিংবা সম্পদের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার মতো ঘটনা সামনে এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডও প্রশ্নের মুখে আসতে পারে

গত পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংকের কোনো পাওনাদারের সঙ্গে দেনদরবার, ক্ষতি বা ব্যয়ের হিসাব কিংবা আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো ক্ষতির হিসাব ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে দেখানো, কল্পিত ক্ষতির তথ্য উপস্থাপন বা কোনো আর্থিক লেনদেনকে ভিন্নভাবে দেখানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণা বা অন্যান্য অপরাধের প্রশ্ন উঠতে পারে।

অন্যের কর্মকাণ্ডেও দায়ের ঝুঁকি

ব্যাংকের কোনো সম্পত্তি অবৈধভাবে বন্ধক রাখা বা স্থানান্তরের ঘটনায় একজন কর্মকর্তা সরাসরি যুক্ত না থাকলেও তিনি বিষয়টি জানতেন কি না, দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। অর্থাৎ, অন্য কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজের দায়িত্বের সীমা ও ভূমিকা কতটা ছিল, সেটিও আইনি জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শাস্তির বিধান কতটা কঠোর

আইনের ৬৩ ধারায় ৫৯ ধারার আওতায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে। ধারা ৬৩(১)-এ বলা হয়েছে, এই আইনের ৫৯ ধারার উপধারা (১)-এর দফা (গ)-এর উপদফা (অ), (ই), (ঈ), (উ) এবং (ঘ), (চ), (ছ) ও (জ)-এর আওতায় কোনো অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ, আইনটির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডের বিধান থাকায় এর প্রভাব ব্যক্তির পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপরও পড়তে পারে।

ধারা ৬৩(২)-এ বলা হয়েছে, এ ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রশাসক, অবসায়ক বা রেজল্যুশনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি কিংবা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।

এখন করণীয় কী

আইনের কঠোর বিধান দেখে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচালকদের এখন থেকেই সতর্ক হওয়া বেশি জরুরি। দায়িত্ব পালনকালে নিজের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের একটি স্বচ্ছ ও যথাযথ রেকর্ড রাখা ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

১. সব নথিপত্র যাচাই করুন: নিজের অধীনে থাকা বা অতীতে তত্ত্বাবধান করা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ, রেজিস্টার, রেকর্ড ও দলিলপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো গরমিল, অসঙ্গতি বা তথ্যের ঘাটতি থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

২. কোনো তথ্য গোপন করবেন না: বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রশাসক বা অবসায়কের কোনো চাওয়া বা নির্দেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো তথ্য গোপন করা, নথি আটকে রাখা বা অযথা সময়ক্ষেপণ ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সময়মতো দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের রেকর্ড সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

৩. দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন: নিজের শাখা, দপ্তর বা কর্মপরিধিতে কোনো অনিয়ম, সন্দেহজনক লেনদেন বা ভুয়া তথ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা প্রয়োজন। সন্দেহজনক কোনো বিষয় নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে কোনো তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ পাবেন।

ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়-দেনা স্থানান্তরের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক তথ্য, নথিপত্র, সম্পদ, ঋণ ও অতীতের সিদ্ধান্তের হিসাব। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচালকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সতর্কতা, নথিপত্রে স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে যথাযথ আইনি সচেতনতা নিশ্চিত করা।

আজকের একটি অবহেলা বা অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। তাই আতঙ্কিত হয়ে নয়, বরং সময় থাকতে নিজের দায়িত্ব, নথিপত্র ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।