০১:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

দারিদ্র্যের ফাঁদে নতুন ৮০ লাখ, ঝুঁকিতে আরও ৬ কোটি ২০ লাখ

The gallery was not found!

একসময় যে বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য দিয়ে বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিল, সেই দেশেই এখন উল্টো স্রোত। টানা চার বছর ধরে বাড়ছে দারিদ্র্য। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা ও বিনিয়োগে স্থবিরতার চাপে গত চার বছরে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। এর বাইরে দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা আরও ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ রয়েছেন বড় ধরনের ঝুঁকিতে।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, চলতি অর্থবছর শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির বদলে সামনে আরও চাপ তৈরির আশঙ্কাই বেশি।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়। ওই বছর নতুন করে দরিদ্র হন প্রায় ৮ লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে সাড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছায় এবং ওই বছর দরিদ্র হন আরও ৩৭ লাখ মানুষ।

২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। নতুন করে দরিদ্র হন ১৪ লাখ মানুষ। চলতি বছরে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। সব মিলিয়ে চার বছরে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ লাখ। একই সময়ে বেড়েছে আয়বৈষম্যও।

বড় ঝুঁকিতে নিম্নমধ্যবিত্ত

বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে রয়েছেন। তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা এতটাই সীমিত যে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হারানো, অসুস্থতা কিংবা বন্যার মতো দুর্যোগ তাঁদের দ্রুত দরিদ্র করে দিতে পারে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে দারিদ্র্য দ্রুত কমানোর জন্য এই কর্মসংস্থান যথেষ্ট নয়।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের চাপ, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা নতুন মূল্যবৃদ্ধির মতো একটি ধাক্কাই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

দুই দশকের সাফল্যে ছেদ

২০০১ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পরের দুই দশকে ধারাবাহিকভাবে তা কমে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু এরপর সেই অগ্রগতির ধারায় ছেদ পড়েছে।

বিবিএসের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান দারিদ্র্যের হার বিবেচনায় দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি হতে পারে।

সেলিম রায়হানের মতে, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে এই পরিস্থিতি বদলানো যাবে না। প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সুরক্ষা দিচ্ছে—নীতিনির্ধারণে এখন এসব বিষয়কেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

দারিদ্র্যের ফাঁদে নতুন ৮০ লাখ, ঝুঁকিতে আরও ৬ কোটি ২০ লাখ

Update Time : ১১:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

একসময় যে বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য দিয়ে বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিল, সেই দেশেই এখন উল্টো স্রোত। টানা চার বছর ধরে বাড়ছে দারিদ্র্য। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা ও বিনিয়োগে স্থবিরতার চাপে গত চার বছরে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। এর বাইরে দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা আরও ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ রয়েছেন বড় ধরনের ঝুঁকিতে।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, চলতি অর্থবছর শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির বদলে সামনে আরও চাপ তৈরির আশঙ্কাই বেশি।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়। ওই বছর নতুন করে দরিদ্র হন প্রায় ৮ লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে সাড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছায় এবং ওই বছর দরিদ্র হন আরও ৩৭ লাখ মানুষ।

২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। নতুন করে দরিদ্র হন ১৪ লাখ মানুষ। চলতি বছরে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। সব মিলিয়ে চার বছরে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ লাখ। একই সময়ে বেড়েছে আয়বৈষম্যও।

বড় ঝুঁকিতে নিম্নমধ্যবিত্ত

বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে রয়েছেন। তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা এতটাই সীমিত যে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হারানো, অসুস্থতা কিংবা বন্যার মতো দুর্যোগ তাঁদের দ্রুত দরিদ্র করে দিতে পারে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে দারিদ্র্য দ্রুত কমানোর জন্য এই কর্মসংস্থান যথেষ্ট নয়।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের চাপ, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা নতুন মূল্যবৃদ্ধির মতো একটি ধাক্কাই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

দুই দশকের সাফল্যে ছেদ

২০০১ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পরের দুই দশকে ধারাবাহিকভাবে তা কমে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু এরপর সেই অগ্রগতির ধারায় ছেদ পড়েছে।

বিবিএসের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান দারিদ্র্যের হার বিবেচনায় দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি হতে পারে।

সেলিম রায়হানের মতে, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে এই পরিস্থিতি বদলানো যাবে না। প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সুরক্ষা দিচ্ছে—নীতিনির্ধারণে এখন এসব বিষয়কেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।