‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’—এমন ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয়েছিল একটি সন্দেহভাজন চালান। কায়িক পরীক্ষায় সেই চালানেই মিলল খণ্ডিত একটি বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার, বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের সামনের অর্ধাংশ এবং পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক। ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ার পর চালানটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি)।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ বুধবার (৭ অক্টোবর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে চালানটির কায়িক পরীক্ষা করা হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চালানটির আমদানিকারক মেসার্স আয়াজ অটো ইন্টারন্যাশনাল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরব জাপান ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস কোম্পানি এলএলসি থেকে চালানটি রপ্তানি করা হয়েছে। কাগজপত্রে ব্যবহৃত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানির কথা বলা হলেও পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যের ধরন ও অবস্থার সঙ্গে ঘোষণার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
কায়িক পরীক্ষায় প্রথমে পাওয়া যায় খণ্ডিত অবস্থায় থাকা একটি দুই আসনের বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার। প্রাথমিকভাবে গাড়িটির মডেল ‘এস ড্রাইভ ২৩আই’ বলে ধারণা করছে কাস্টমস। এর ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিসি এবং গাড়িটি ২০০৯ সালের মডেল হতে পারে বলেও প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গাড়িটির সঠিক মডেল, উৎপাদন সাল, চেসিস নম্বর, ভিআইএন এবং বাংলাদেশে আমদানির বৈধতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। নথিপত্র ও কারিগরি যাচাই শেষে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হবে।
চালানটিতে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হলো বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের খণ্ডিত সামনের অংশ। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০১৬ সালের মডেল এবং ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার সিসি। কিন্তু গাড়িটির শুধু সামনের অর্ধাংশ পাওয়া যাওয়ায় তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা এখন খতিয়ে দেখছেন, গাড়িটির বাকি অংশ এর আগে অন্য কোনো চালানে দেশে আনা হয়েছে কি না। আবার পরবর্তী কোনো চালানে সেটি আনার পরিকল্পনা ছিল কি না, তাও যাচাই করা হচ্ছে। খণ্ডিত গাড়ির বিভিন্ন অংশ আলাদা চালানে এনে পরে দেশে পুনঃসংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয়।
পাঁচ খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক
বিএমডব্লিউর পাশাপাশি চালানটিতে পাওয়া গেছে পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক। এসব ট্রাকের কেবিনের ভেতর বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্যাক করে রাখা হয়েছিল। এর বাইরে আরও বেশ কিছু ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে।
ফলে শুধু পণ্যের ঘোষণায় অসঙ্গতিই নয়, এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য এবং আমদানির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উদ্ধার হওয়া প্রতিটি পণ্যের বিস্তারিত তালিকা তৈরির পাশাপাশি গাড়ি ও গাড়ির অংশগুলোর চেসিস নম্বর, ভিআইএন, ইঞ্জিনের তথ্য ও প্রকৃত মূল্য যাচাই করছে কাস্টমস।
নজরে শুল্ক-কর ফাঁকি
কাস্টমস গোয়েন্দা বলছে, ঘোষিত পণ্য ও কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তদন্তে ঘোষণায় কারচুপি, প্রকৃত পণ্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা এবং খণ্ডিত গাড়ির অংশ আলাদা চালানে এনে পরে সম্পূর্ণ গাড়ি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের বাকি অর্ধাংশের অবস্থান জানতে সংশ্লিষ্ট অন্য চালানের তথ্যও যাচাই করা হবে। একই আমদানিকারক বা রপ্তানিকারকের মাধ্যমে এর আগে বা পরে একই ধরনের কোনো চালান এসেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যাচাই হচ্ছে আমদানি নথি
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উদ্ধার হওয়া গাড়ি ও যন্ত্রাংশের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হবে। কারণ পণ্যের মূল্য কম দেখানো হয়ে থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শুল্ক-কর নির্ধারণে।
এ জন্য প্রতিটি গাড়ির মডেল, উৎপাদন সাল, ইঞ্জিন ক্ষমতা, চেসিস নম্বর ও ভিআইএন যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব এন্ট্রি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আমদানি নথিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আমদানি করা পণ্যগুলো দেশের প্রচলিত আমদানি নীতি ও শুল্ক-কর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও যাচাই করবে কাস্টমস।
তদন্তে ঘোষণায় কারচুপি, শুল্ক-কর ফাঁকি বা আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
এ ঘটনায় শুধু এই চালানেই তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই ধরনের পণ্য আমদানির আগের ও পরের চালানও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। খণ্ডিত গাড়ির অংশ আলাদা চালানে এনে দেশে সম্পূর্ণ গাড়ি তৈরি বা পুনঃসংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















