একসঙ্গে ৩০ ব্যাংকের এটিএম, কার্ড, পিওএস, ই-কমার্স, কিউআর ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সামনে এসেছে ভিন্ন কারণ। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের জানিয়েছিল, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি, এর নেপথ্যে ছিল কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি (আইটিসিএল) এবং রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের মধ্যে চুক্তি ও বকেয়া অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, আইটিসিএলের কাছে প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার পাওনা দাবি করছিল কম্পাস প্লাস। পাওনা পরিশোধ ও চুক্তি-সংক্রান্ত জটিলতার জেরে রুশ প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়। এতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকেরা হঠাৎ করে বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন।
৪ অক্টোবর রাত ৯টার পর থেকে একযোগে সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় অনেক গ্রাহক এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারেননি। কার্ড দিয়ে পিওএসে কেনাকাটা, অনলাইন লেনদেন, ই-কমার্স, কিউআর ও এনপিএসবি-সংশ্লিষ্ট কিছু সেবাও বন্ধ হয়ে যায়।
১৫ লাখ ডলারের বকেয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ওই কর্মকর্তা বলেন, আইটিসিএল দেশের ৩৩টি ব্যাংককে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এটিএম-সংশ্লিষ্ট সেবা দিয়ে থাকে। এসব প্রযুক্তিগত সেবার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার কম্পাস প্লাসের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে কিউ-ক্যাশের সেবা বন্ধ হয়নি। কম্পাস প্লাসের সঙ্গে চুক্তি জটিলতা এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়কে কেন্দ্র করেই আইটিসিএলের সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, কম্পাস প্লাস আইটিসিএলের কাছে প্রায় ১৫ লাখ ডলার পাওনা দাবি করছে। এ অর্থ পরিশোধ এবং চুক্তি নিয়ে বিরোধের জেরেই কিউ-ক্যাশের সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
ভোগান্তিতে লাখ লাখ গ্রাহক
কিউ-ক্যাশের সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকেরা একযোগে ভোগান্তিতে পড়েন। জরুরি সময়ে এটিএম থেকে নগদ টাকা তোলা, দোকানে কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট কিংবা অনলাইন কেনাকাটার মতো সেবাগুলো ব্যবহার করতে না পেরে বিপাকে পড়েন অনেকে।
কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ, কমিউনিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও উরি ব্যাংক বাংলাদেশ।
গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল ‘সিস্টেম আপগ্রেড’
সেবা বন্ধের সময় ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে গ্রাহকদের পাঠানো বার্তায় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়। অনেক ব্যাংক এসএমএসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এটিএম, কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেন সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি জানায়।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ওই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, মূল সমস্যা ছিল আইটিসিএল ও কম্পাস প্লাসের মধ্যকার ব্যবসায়িক চুক্তি এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ।
এতে সেবা বন্ধের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ‘সিস্টেম মাইগ্রেশন’ সামনে এলেও এর পেছনে ছিল অর্থ পরিশোধ ও বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে জটিলতা।
দ্রুত হস্তক্ষেপ বাংলাদেশ ব্যাংকের
সেবা বন্ধের খবর পাওয়ার পর গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত তৎপর হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ডেকে পাঠায়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে কম্পাস প্লাসের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই সমস্যার সমাধান করতে আইটিসিএলকে নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কম্পাস প্লাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
এরপর আইটিসিএল ও কম্পাস প্লাসের মধ্যে সমঝোতা হলে মঙ্গলবার রাতেই কিউ-ক্যাশের সেবা চালু হয়।
স্বাভাবিক হচ্ছে লেনদেন
সমঝোতার পর বুধবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ব্যাংক এশিয়াসহ কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকদের এসএমএস পাঠিয়ে সেবা পুনরায় চালুর বিষয়টি জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য জানিয়েছে, কিউ-ক্যাশের সমস্যার কারণে দেশের সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। এনপিএসবির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবা চালু ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত বিএসিপিএস, বিইএফটিএন ও আরটিজিএসও স্বাভাবিক ছিল।
তবে এই ঘটনায় ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকদের সামনে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের কথা বলে যে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল, তার নেপথ্যে যদি ১৫ লাখ ডলারের বকেয়া ও ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে বিরোধই মূল কারণ হয়ে থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কাছে প্রকৃত কারণটি স্পষ্ট করা হয়নি কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















