০১:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

সুপারিশ পেয়েও বেকার, গেজেটের অপেক্ষায় হাজারো বিসিএস প্রার্থী

The gallery was not found!

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই ফোন হাতে নেন তিনি। ৪৫তম বিসিএসের প্রার্থীদের গ্রুপে ঢুকে খোঁজ নেন, সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখেন—কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ গেজেট। কিন্তু প্রতিটি সকালই তার জন্য নিয়ে আসে অপেক্ষার আরেকটি দিন। চাকরির জন্য দীর্ঘ লড়াই শেষে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেয়েও এখনো কর্মহীন তিনি।

‘কাগজে-কলমে আমার চাকরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে আমি এখনো বেকার’—আক্ষেপ করে বলেন ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত এই প্রার্থী।

চার বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরির দ্বারপ্রান্তে এসে থমকে যেতে হয়েছে তাকে। ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রিলিমিনারি এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৮ জুলাই শুরু হয় মৌখিক পরীক্ষা। সবশেষে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয় ১ হাজার ৮০৭ জনকে।

কিন্তু চূড়ান্ত সুপারিশের পর পেরিয়ে গেছে ১০ মাসেরও বেশি সময়। এখনো প্রকাশিত হয়নি নিয়োগের গেজেট।

ফলে কাগজে চাকরি পেলেও বাস্তবে কর্মহীন হাজারো তরুণ-তরুণী। কেউ আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আশায়, কেউ অন্য চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না, আবার কেউ পরিবারকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই করতে পারছেন না।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সিভিল প্রশাসনে জনবল সংকট ও বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ রয়েছে। এমন বাস্তবতায় নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় নেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, মেডিকেল ছাড়পত্রের পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং এর আইনি ভিত্তি রয়েছে। তবে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

‘সরকার চাইলে অতিরিক্ত যাচাই করতে পারে। কিন্তু ১০ মাসের বিলম্ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়,’ বলেন তিনি।

তার মতে, সরকার আন্তরিক হলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই ভেরিফিকেশন ও গেজেট প্রকাশের কাজ শেষ করা সম্ভব। দীর্ঘসূত্রতা শুধু সফল প্রার্থীদের হতাশ করে না, বরং নানা ধরনের নেতিবাচক অনুমানের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অপেক্ষা শুধু ৪৫তমদের নয়

৪৫তম বিসিএসের প্রার্থীদের মতো একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্তরাও।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ৪৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে ১ হাজার ৪৫৭ জনকে সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হয়। তাদেরও নিয়োগ গেজেটের অপেক্ষায় কেটে গেছে ২৩৫ দিন।

আর ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে ক্যাডার পদে ১ হাজার ৩২০ এবং নন-ক্যাডার পদে ২০১ জনকে সুপারিশ করা হয়। চার মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের দুই প্রার্থী জানান, দীর্ঘ অপেক্ষা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও চাপ তৈরি করছে।

৪৬তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন বলেন, ‘আমার বাবা-মায়ের বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন তারা। আমি চাকরিতে যোগ দিলে তারা সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। অথচ পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পরও আমি এখনো বেকার।’

প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরেকজন বলেন, এই বিলম্ব তার ক্যারিয়ার নিয়েও শঙ্কা তৈরি করেছে।

‘আমাদের যোগদানে দেরি হওয়ার মানেই হলো চাকরির সময়কাল কমে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত এটি আমাদের পদোন্নতির সুযোগকেও সংকুচিত করতে পারে,’ বলেন তিনি।

আগের বিসিএসেও দীর্ঘ অপেক্ষা

নিয়োগ গেজেট প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা অবশ্য নতুন নয়। ৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের প্রায় ২৩১ দিন পর ২০২৪ সালের মার্চে নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয়। ৪৩তম বিসিএসের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সুপারিশের পর প্রথম গেজেট প্রকাশে সময় লাগে প্রায় ২৯৪ দিন।

৪০তম বিসিএসের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর গেজেট হতে সময় লেগেছিল ২১৬ দিন।

তবে সব বিসিএসের চিত্র এক নয়। ৪৪তম বিসিএসের প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছিল। আর চিকিৎসকদের জন্য ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে চূড়ান্ত ফলের পর গেজেট প্রকাশে সময় লেগেছিল প্রায় ১৩৩ দিন। শিক্ষকদের জন্য ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয় চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর।

এক চাকরি ছেড়ে অন্যটির অপেক্ষায়

৪৫তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক প্রার্থীর অপেক্ষাটা আরও কঠিন। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার আশায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারের চাকরি ছেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু নতুন চাকরির গেজেট না হওয়ায় এখন তিনি কর্মহীন।

‘সবাই মনে করে আমি যেহেতু চূড়ান্ত তালিকায় টিকেছি, তাই আমি বিসিএস ক্যাডার। কিন্তু বাস্তবে কোথাও যোগ দিইনি, কোনো পোস্টিং নেই, নিয়মিত আয়েরও কোনো উৎস নেই,’ বলেন তিনি।

গেজেট প্রকাশের অনিশ্চয়তায় নতুন চাকরিতেও যোগ দিতে পারছেন না তিনি।

‘হঠাৎ গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েও অল্প সময়ের মধ্যে ছাড়তে হতে পারে। তাই নতুন কর্মসংস্থান খুঁজব, নাকি অপেক্ষা করব—বুঝতে পারছি না,’ বলেন তিনি।

গ্রামীণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ৪৫তম বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক তরুণীর অবস্থাও একই। বর্তমানে অন্য একটি চাকরি করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

‘আমি জানি না গেজেট কবে হবে, কবে চাকরিতে যোগ দেব, কখন বর্তমান চাকরি ছাড়ব। সবকিছুই যেন অনিশ্চিত,’ বলেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতেই অনেক সময় লাগে। এরপর তথ্য যাচাইসহ গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক। তবে বিসিএস প্রার্থীদের অযথা হয়রানি করার কোনো ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই,’ বলেন তিনি।

তার ভাষ্য, যোগ্য কেউ চাকরি থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সরকার সবার সঙ্গে ন্যায়বিচার করছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগ গেজেট চলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। ৪৬তম বিসিএসের গেজেট চলতি মাসের শেষ নাগাদ প্রকাশিত হতে পারে। ৪৭তম বিসিএসের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি সময় লাগলেও গেজেট শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে প্রার্থীদের কাছে এখন আর আশ্বাস নয়, কাঙ্ক্ষিত গেজেটই সবচেয়ে জরুরি। বছরের পর বছর পরীক্ষা, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া তরুণদের প্রশ্ন একটাই—কাগজে পাওয়া চাকরিটি বাস্তবে পাওয়ার জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

সুপারিশ পেয়েও বেকার, গেজেটের অপেক্ষায় হাজারো বিসিএস প্রার্থী

Update Time : ১২:৪৮:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই ফোন হাতে নেন তিনি। ৪৫তম বিসিএসের প্রার্থীদের গ্রুপে ঢুকে খোঁজ নেন, সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখেন—কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ গেজেট। কিন্তু প্রতিটি সকালই তার জন্য নিয়ে আসে অপেক্ষার আরেকটি দিন। চাকরির জন্য দীর্ঘ লড়াই শেষে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেয়েও এখনো কর্মহীন তিনি।

‘কাগজে-কলমে আমার চাকরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে আমি এখনো বেকার’—আক্ষেপ করে বলেন ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত এই প্রার্থী।

চার বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরির দ্বারপ্রান্তে এসে থমকে যেতে হয়েছে তাকে। ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রিলিমিনারি এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৮ জুলাই শুরু হয় মৌখিক পরীক্ষা। সবশেষে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয় ১ হাজার ৮০৭ জনকে।

কিন্তু চূড়ান্ত সুপারিশের পর পেরিয়ে গেছে ১০ মাসেরও বেশি সময়। এখনো প্রকাশিত হয়নি নিয়োগের গেজেট।

ফলে কাগজে চাকরি পেলেও বাস্তবে কর্মহীন হাজারো তরুণ-তরুণী। কেউ আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আশায়, কেউ অন্য চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না, আবার কেউ পরিবারকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই করতে পারছেন না।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সিভিল প্রশাসনে জনবল সংকট ও বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ রয়েছে। এমন বাস্তবতায় নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় নেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, মেডিকেল ছাড়পত্রের পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং এর আইনি ভিত্তি রয়েছে। তবে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

‘সরকার চাইলে অতিরিক্ত যাচাই করতে পারে। কিন্তু ১০ মাসের বিলম্ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়,’ বলেন তিনি।

তার মতে, সরকার আন্তরিক হলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই ভেরিফিকেশন ও গেজেট প্রকাশের কাজ শেষ করা সম্ভব। দীর্ঘসূত্রতা শুধু সফল প্রার্থীদের হতাশ করে না, বরং নানা ধরনের নেতিবাচক অনুমানের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অপেক্ষা শুধু ৪৫তমদের নয়

৪৫তম বিসিএসের প্রার্থীদের মতো একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্তরাও।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ৪৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে ১ হাজার ৪৫৭ জনকে সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হয়। তাদেরও নিয়োগ গেজেটের অপেক্ষায় কেটে গেছে ২৩৫ দিন।

আর ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে ক্যাডার পদে ১ হাজার ৩২০ এবং নন-ক্যাডার পদে ২০১ জনকে সুপারিশ করা হয়। চার মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের দুই প্রার্থী জানান, দীর্ঘ অপেক্ষা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও চাপ তৈরি করছে।

৪৬তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন বলেন, ‘আমার বাবা-মায়ের বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন তারা। আমি চাকরিতে যোগ দিলে তারা সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। অথচ পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পরও আমি এখনো বেকার।’

প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরেকজন বলেন, এই বিলম্ব তার ক্যারিয়ার নিয়েও শঙ্কা তৈরি করেছে।

‘আমাদের যোগদানে দেরি হওয়ার মানেই হলো চাকরির সময়কাল কমে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত এটি আমাদের পদোন্নতির সুযোগকেও সংকুচিত করতে পারে,’ বলেন তিনি।

আগের বিসিএসেও দীর্ঘ অপেক্ষা

নিয়োগ গেজেট প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা অবশ্য নতুন নয়। ৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের প্রায় ২৩১ দিন পর ২০২৪ সালের মার্চে নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয়। ৪৩তম বিসিএসের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সুপারিশের পর প্রথম গেজেট প্রকাশে সময় লাগে প্রায় ২৯৪ দিন।

৪০তম বিসিএসের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর গেজেট হতে সময় লেগেছিল ২১৬ দিন।

তবে সব বিসিএসের চিত্র এক নয়। ৪৪তম বিসিএসের প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছিল। আর চিকিৎসকদের জন্য ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে চূড়ান্ত ফলের পর গেজেট প্রকাশে সময় লেগেছিল প্রায় ১৩৩ দিন। শিক্ষকদের জন্য ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয় চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর।

এক চাকরি ছেড়ে অন্যটির অপেক্ষায়

৪৫তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক প্রার্থীর অপেক্ষাটা আরও কঠিন। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার আশায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারের চাকরি ছেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু নতুন চাকরির গেজেট না হওয়ায় এখন তিনি কর্মহীন।

‘সবাই মনে করে আমি যেহেতু চূড়ান্ত তালিকায় টিকেছি, তাই আমি বিসিএস ক্যাডার। কিন্তু বাস্তবে কোথাও যোগ দিইনি, কোনো পোস্টিং নেই, নিয়মিত আয়েরও কোনো উৎস নেই,’ বলেন তিনি।

গেজেট প্রকাশের অনিশ্চয়তায় নতুন চাকরিতেও যোগ দিতে পারছেন না তিনি।

‘হঠাৎ গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েও অল্প সময়ের মধ্যে ছাড়তে হতে পারে। তাই নতুন কর্মসংস্থান খুঁজব, নাকি অপেক্ষা করব—বুঝতে পারছি না,’ বলেন তিনি।

গ্রামীণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ৪৫তম বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক তরুণীর অবস্থাও একই। বর্তমানে অন্য একটি চাকরি করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

‘আমি জানি না গেজেট কবে হবে, কবে চাকরিতে যোগ দেব, কখন বর্তমান চাকরি ছাড়ব। সবকিছুই যেন অনিশ্চিত,’ বলেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতেই অনেক সময় লাগে। এরপর তথ্য যাচাইসহ গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক। তবে বিসিএস প্রার্থীদের অযথা হয়রানি করার কোনো ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই,’ বলেন তিনি।

তার ভাষ্য, যোগ্য কেউ চাকরি থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সরকার সবার সঙ্গে ন্যায়বিচার করছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগ গেজেট চলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। ৪৬তম বিসিএসের গেজেট চলতি মাসের শেষ নাগাদ প্রকাশিত হতে পারে। ৪৭তম বিসিএসের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি সময় লাগলেও গেজেট শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে প্রার্থীদের কাছে এখন আর আশ্বাস নয়, কাঙ্ক্ষিত গেজেটই সবচেয়ে জরুরি। বছরের পর বছর পরীক্ষা, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া তরুণদের প্রশ্ন একটাই—কাগজে পাওয়া চাকরিটি বাস্তবে পাওয়ার জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?