০১:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

দাম বাড়ে, আয় বাড়ে না—চাপে মধ্যবিত্ত

The gallery was not found!

মাসের শুরুতে একসঙ্গে বড় বাজার করার দিন যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার পিকআপচালক দেলোয়ার হোসেন এখন প্রয়োজনের পণ্যটুকুই অল্প অল্প করে কেনেন। ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মাসিক আয়ের সংসারে স্ত্রীও প্রতিবেশীদের পোশাক সেলাই করে বাড়তি ৫ হাজার টাকা আয় করছেন। তবু মাসের শেষে হিসাব মেলানো কঠিন। কোন পণ্যটি আজ কিনতে হবে আর কোনটি আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত না কিনলেও চলবে—প্রতিটি কেনাকাটার আগে এখন সেই হিসাব করতে হয়।

দেলোয়ারের এই হিসাব আসলে এখন বহু মধ্যবিত্ত পরিবারেরই হিসাব। আয় সামান্য বাড়লেও তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। বাজারের নিত্যপণ্য থেকে বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস, বাসভাড়া, বাড়িভাড়া—প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি খরচ। ফলে সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে মানুষ বাজারের পরিমাণ কমাচ্ছে, খাবারের তালিকা বদলাচ্ছে, বাইরে খাওয়া বাদ দিচ্ছে; কেউ কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, আবার অনেকে ধার করে মাস পার করছেন।

আগস্টে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে থাকলেও মানুষের বাস্তব জীবনে চাপ কমেনি। একই সময়ে মজুরি হার সূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে। ফলে আয় বাড়ার পরও অনেক পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

এর ওপর সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব যোগ হয়েছে। ফলে সামনে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ বাবলুর দোকানে এই পরিবর্তনের ছবি প্রতিদিনই দেখা যায়। আগে যে ক্রেতা পাঁচ লিটার তেল কিনতেন, এখন তিনি দুই লিটার নিচ্ছেন। এক লিটার কেনা ক্রেতাও অনেক সময় আধা লিটারেই কাজ চালাচ্ছেন। আটার দাম এক মাসে কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫-৭০ টাকায় ওঠায় ক্রেতাদের অনেকেই পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

চাপটি শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইসহাক বিন শরীফের মাসিক আয় ৪২ হাজার থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে তার বাড়িভাড়া ৭ হাজার থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বেতন বাড়লেও সংসারে স্বস্তি ফেরেনি।

আর মুন্সিগঞ্জের বেসরকারি চাকরিজীবী নাদিম হোসেনের মতো অনেকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের সমন্বয় করতে না পেরে প্রায় এক বছর ধরে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

এদিকে বাজারে পণ্যের দামও স্থির নয়। টিসিবির পর্যবেক্ষণে থাকা ৫০টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে ৩৩টির দাম ১৭ ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৪ অক্টোবর বেশি ছিল। ডিম, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, চিনি, আলু, গরু ও খাসির মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম এক বছর আগের তুলনায়ও বেশি।

ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও মানুষের কাছে স্বস্তির অর্থ তৈরি হচ্ছে না। কারণ দাম কমছে না, শুধু বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। এই বাস্তবতায় মধ্যবিত্তের সংসারে এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে বাজারের ব্যাগে—ব্যাগ ছোট হচ্ছে, কিন্তু হিসাবের খাতা ক্রমেই বড় হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

দাম বাড়ে, আয় বাড়ে না—চাপে মধ্যবিত্ত

Update Time : ১২:৪৩:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

মাসের শুরুতে একসঙ্গে বড় বাজার করার দিন যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার পিকআপচালক দেলোয়ার হোসেন এখন প্রয়োজনের পণ্যটুকুই অল্প অল্প করে কেনেন। ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মাসিক আয়ের সংসারে স্ত্রীও প্রতিবেশীদের পোশাক সেলাই করে বাড়তি ৫ হাজার টাকা আয় করছেন। তবু মাসের শেষে হিসাব মেলানো কঠিন। কোন পণ্যটি আজ কিনতে হবে আর কোনটি আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত না কিনলেও চলবে—প্রতিটি কেনাকাটার আগে এখন সেই হিসাব করতে হয়।

দেলোয়ারের এই হিসাব আসলে এখন বহু মধ্যবিত্ত পরিবারেরই হিসাব। আয় সামান্য বাড়লেও তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। বাজারের নিত্যপণ্য থেকে বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস, বাসভাড়া, বাড়িভাড়া—প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি খরচ। ফলে সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে মানুষ বাজারের পরিমাণ কমাচ্ছে, খাবারের তালিকা বদলাচ্ছে, বাইরে খাওয়া বাদ দিচ্ছে; কেউ কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, আবার অনেকে ধার করে মাস পার করছেন।

আগস্টে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে থাকলেও মানুষের বাস্তব জীবনে চাপ কমেনি। একই সময়ে মজুরি হার সূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে। ফলে আয় বাড়ার পরও অনেক পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

এর ওপর সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব যোগ হয়েছে। ফলে সামনে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ বাবলুর দোকানে এই পরিবর্তনের ছবি প্রতিদিনই দেখা যায়। আগে যে ক্রেতা পাঁচ লিটার তেল কিনতেন, এখন তিনি দুই লিটার নিচ্ছেন। এক লিটার কেনা ক্রেতাও অনেক সময় আধা লিটারেই কাজ চালাচ্ছেন। আটার দাম এক মাসে কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫-৭০ টাকায় ওঠায় ক্রেতাদের অনেকেই পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

চাপটি শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইসহাক বিন শরীফের মাসিক আয় ৪২ হাজার থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে তার বাড়িভাড়া ৭ হাজার থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বেতন বাড়লেও সংসারে স্বস্তি ফেরেনি।

আর মুন্সিগঞ্জের বেসরকারি চাকরিজীবী নাদিম হোসেনের মতো অনেকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের সমন্বয় করতে না পেরে প্রায় এক বছর ধরে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

এদিকে বাজারে পণ্যের দামও স্থির নয়। টিসিবির পর্যবেক্ষণে থাকা ৫০টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে ৩৩টির দাম ১৭ ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৪ অক্টোবর বেশি ছিল। ডিম, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, চিনি, আলু, গরু ও খাসির মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম এক বছর আগের তুলনায়ও বেশি।

ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও মানুষের কাছে স্বস্তির অর্থ তৈরি হচ্ছে না। কারণ দাম কমছে না, শুধু বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। এই বাস্তবতায় মধ্যবিত্তের সংসারে এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে বাজারের ব্যাগে—ব্যাগ ছোট হচ্ছে, কিন্তু হিসাবের খাতা ক্রমেই বড় হচ্ছে।