০১:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বাসের স্টিয়ারিং ফাঁকা, রিকশার হ্যান্ডেলে শ্রমিকের ভিড়

The gallery was not found!

ঢাকার গণপরিবহনে এখন শুধু বাসের সংকট নয়, সংকট বাস চালানোর মানুষেও। রাস্তায় বাস আছে, রুট আছে, যাত্রীও আছে; কিন্তু অনেক মালিকের কাছে নেই পর্যাপ্ত চালক ও সহকারী।

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট, চুক্তিভিত্তিক আয়ের অনিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং প্রতিকূল কর্মপরিবেশে বাসের চাকরি ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার দিকে ঝুঁকছেন শ্রমিকদের একটি অংশ। কারণ সেখানে তুলনামূলক কম সময় কাজ করেও প্রতিদিন হাতে টাকা পাওয়ার সুযোগ আছে, নিজের ইচ্ছামতো কাজ বন্ধ রাখার স্বাধীনতাও আছে।

ফলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে লাখ লাখ মানুষের চলাচলের প্রধান বাহন বাস পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে অলস পড়ে থাকছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।

আয় যেখানে মূল চালিকা শক্তি

ঢাকার সড়কে একজন বাসচালক বা সহকারীকে টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হয় বলে খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। এরপরও দৈনিক আয় অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকার আশপাশে থাকে। বিপরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি আয় করার সুযোগ রয়েছে বলে শ্রমিক ও মালিকদের দাবি।

তবে শুধু বেশি আয়ই নয়, নগদ টাকা প্রতিদিন হাতে পাওয়ার বিষয়টিও বড় আকর্ষণ। বাসে চুক্তিভিত্তিক পরিচালনায় আয় অনেক সময় ট্রিপ ও যাত্রীর ওপর নির্ভর করে। যানজটে আটকে গেলে ট্রিপ কমে, কমে যায় শ্রমিকের আয়ও।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পরিবহন খাতের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নিয়েও বড় ধরনের বাস্তবায়ন ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। মজুরি বোর্ডে চালকদের জন্য অঞ্চল ও লাইসেন্সভেদে ১৪ হাজার ৪৪০ থেকে ২০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও রাজধানীর অধিকাংশ বাস এখনো চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে চলছে বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ কাগজে নির্ধারিত মজুরি আর বাস্তব আয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।

শ্রমিক নেই, বাসও নামছে না

ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের হিসাবে প্রধান টার্মিনালগুলো ঘিরে প্রায় ১০ হাজার বাস চলাচল করে। এসব বাস পরিচালনায় চালক, সহকারী ও কন্ডাক্টর মিলিয়ে প্রয়োজন অন্তত ৬০ হাজার শ্রমিক।

ডিটিসিএর তথ্যেও রাজধানীর গণপরিবহনে বড় ব্যবস্থাপনা ঘাটতির চিত্র পাওয়া যায়। বৃহত্তর ঢাকায় সক্রিয় রুটের সংখ্যা প্রায় ৯০টি। এর মধ্যে ৬১টি রুটে ৪ হাজার ৬৪৫টি বাস চলাচলের তথ্য রয়েছে। সব রুট মিলিয়ে সক্রিয় বাসের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার হতে পারে বলে ধারণা ডিটিসিএ কর্মকর্তাদের।

কিন্তু বাসের সংখ্যা থাকলেই যে পরিবহন সচল থাকে না, শ্রমিক সংকট সেটিই এখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। ঠিকানা পরিবহনের মালিক বেলায়েত হোসেনের ভাষ্য, শতাধিক বাস থাকলেও কর্মীর অভাবে প্রতিদিন ৮০-৯০টির বেশি বাস নামানো যাচ্ছে না। আমিনবাজার থেকে আরিচা সড়কের বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকের অভাবে বাস অলস পড়ে থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ওয়েলকাম ট্রান্সপোর্টের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির ৪৫-৫০টি বাসের জন্য প্রয়োজনীয় চালক ও সহকারীর বড় অংশ পাওয়া যাচ্ছে না।

বাসের চাকরি কেন আকর্ষণ হারাচ্ছে

সমস্যাটি শুধু বেতন কম হওয়ার নয়। বাস শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও তাদের পেশা বদলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থাকা, প্রচণ্ড গরমে কাজ করা, বিশ্রামের অভাব, শৌচাগারের অনিশ্চয়তা এবং ছুটি নিলে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে বাসের চাকরি অনেক শ্রমিকের কাছে কঠিন হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে আছে যাত্রী সামলানোর চাপ এবং সড়কে প্রতিদিনের প্রতিযোগিতা। চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় মালিকের জমা পরিশোধের পর নিজের আয় নিশ্চিত করতে চালককে বেশি ট্রিপ দিতে হয়। বেশি ট্রিপ মানে বেশি যাত্রী ওঠানো, কম সময় থামা এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত গাড়ি চালানোর চাপ।

প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, রাজধানীর অনেক বাস এখনো ‘যত ট্রিপ, তত টাকা’ ধরনের ব্যবস্থায় চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি শ্রমিকের আয় যেমন অনিশ্চিত করে, তেমনি সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতারও জন্ম দেয়।

রিকশায় কেন এত আকর্ষণ

ব্যাটারিচালিত রিকশার সবচেয়ে বড় সুবিধা শ্রমিকদের কাছে তিনটি—আয়, স্বাধীনতা এবং নগদ টাকা। পুরো দিন চালালে প্রায় ২ হাজার টাকা এবং অর্ধদিবসে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মালিকানার ধরন, দৈনিক ভাড়া, চার্জ, গ্যারেজ খরচ ও স্থানীয় বিভিন্ন ব্যয় অনুযায়ী প্রকৃত আয় অবশ্য কমবেশি হয়।

কেউ নিজের রিকশা চালান, কেউ দৈনিক ভাড়ায় নেন। ফলে বড় অঙ্কের মূলধন ছাড়াও এ পেশায় ঢোকার সুযোগ রয়েছে।

ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি নিবন্ধন না থাকায় নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে এ ধরনের যান ১০-১২ লাখের মতো হতে পারে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে বলেও গবেষকদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে গণপরিবহনের জন্য নতুন চাপ। শ্রমিক যেখানে বাস থেকে বেরিয়ে রিকশায় যাচ্ছেন, সেখানে রিকশার সংখ্যা বাড়ছে দ্রুততর গতিতে।

শ্রমিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিরাপত্তা সংকট

ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার শুধু বাস শ্রমিকের পেশা বদলের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়ক নিরাপত্তা ও যানজটের প্রশ্নও।

নিবন্ধন, রুট, চালকের প্রশিক্ষণ এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সড়কে এসব যান হঠাৎ থামানো, লেন পরিবর্তন ও মূল সড়কে প্রবেশের কারণে বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

সাম্প্রতিক এক দুর্ঘটনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও সামনে এসেছে, যা এ যানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে আবারও আলোচনায় এনেছে। তবে পুরো বিষয়টিকে শুধু ‘রিকশা বনাম বাস’ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যাবে।

রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিই কি পথ দেখাবে?

ঢাকার বাস ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে রুটভিত্তিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধের কথা বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ডিটিসিএ বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার রুট চিহ্নিত করেছে। পরিকল্পনায় কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা, জবাবদিহি এবং রুট পুনর্বিন্যাসের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

এই ব্যবস্থায় মালিকের হাতে আলাদা আলাদা বাস দিয়ে চালককে দৈনিক জমা তোলার চাপ দেওয়ার বদলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধীনে বাস পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে চালকের বেতন, কর্মঘণ্টা ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করার সুযোগও বাড়বে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসকে শুধু যান হিসেবে নয়, একটি পেশাগত সেবা হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। চালকের নির্ধারিত বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা কঠিন।

আসল সংকট বাসে নয়, ব্যবস্থাপনায়

ঢাকার গণপরিবহনের সামনে তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সামলাতে হবে, অন্যদিকে বাসের চাকরিকে শ্রমিকের কাছে আবারও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

শুধু রিকশা উচ্ছেদ করে বাস শ্রমিক ফিরিয়ে আনা যাবে না। কারণ শ্রমিক যে কারণে বাস ছেড়েছেন, সেই কারণগুলো যদি একই থাকে, তাহলে অন্য কোনো অনানুষ্ঠানিক পরিবহন খাত আবার তাদের টেনে নেবে।

অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, বাস শ্রমিকদের বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার ঘাটতিই পেশা বদলের বড় কারণ। তার মতে, বাস খাতকে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির আওতায় এনে নির্ধারিত বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা জরুরি।

অর্থাৎ ঢাকার রাস্তায় এখন যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেটি শুধু বাস আর ব্যাটারিচালিত রিকশার মধ্যে নয়। এটি আসলে নিশ্চিত আয়ের চাকরি বনাম অনিশ্চিত কিন্তু স্বাধীন আয়ের পেশার প্রতিযোগিতা।

বাসের স্টিয়ারিং ধরে ১৫-১৬ ঘণ্টা খেটেও যদি শ্রমিকের আয় অনিশ্চিত থাকে, আর রিকশার হ্যান্ডেলে বসে তুলনামূলক কম সময়ে নগদ আয় নিশ্চিত হয়, তাহলে শ্রমিক কেন বাসে থাকবেন—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। কারণ শ্রমিক সংকটকে উপেক্ষা করে শুধু নতুন বাস নামানো গেলেও, চালকের আসন খালি থাকলে সেই বাস শেষ পর্যন্ত রাস্তায় চলবে না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

বাসের স্টিয়ারিং ফাঁকা, রিকশার হ্যান্ডেলে শ্রমিকের ভিড়

Update Time : ১১:৪৭:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার গণপরিবহনে এখন শুধু বাসের সংকট নয়, সংকট বাস চালানোর মানুষেও। রাস্তায় বাস আছে, রুট আছে, যাত্রীও আছে; কিন্তু অনেক মালিকের কাছে নেই পর্যাপ্ত চালক ও সহকারী।

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট, চুক্তিভিত্তিক আয়ের অনিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং প্রতিকূল কর্মপরিবেশে বাসের চাকরি ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার দিকে ঝুঁকছেন শ্রমিকদের একটি অংশ। কারণ সেখানে তুলনামূলক কম সময় কাজ করেও প্রতিদিন হাতে টাকা পাওয়ার সুযোগ আছে, নিজের ইচ্ছামতো কাজ বন্ধ রাখার স্বাধীনতাও আছে।

ফলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে লাখ লাখ মানুষের চলাচলের প্রধান বাহন বাস পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে অলস পড়ে থাকছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।

আয় যেখানে মূল চালিকা শক্তি

ঢাকার সড়কে একজন বাসচালক বা সহকারীকে টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হয় বলে খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। এরপরও দৈনিক আয় অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকার আশপাশে থাকে। বিপরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি আয় করার সুযোগ রয়েছে বলে শ্রমিক ও মালিকদের দাবি।

তবে শুধু বেশি আয়ই নয়, নগদ টাকা প্রতিদিন হাতে পাওয়ার বিষয়টিও বড় আকর্ষণ। বাসে চুক্তিভিত্তিক পরিচালনায় আয় অনেক সময় ট্রিপ ও যাত্রীর ওপর নির্ভর করে। যানজটে আটকে গেলে ট্রিপ কমে, কমে যায় শ্রমিকের আয়ও।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পরিবহন খাতের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নিয়েও বড় ধরনের বাস্তবায়ন ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। মজুরি বোর্ডে চালকদের জন্য অঞ্চল ও লাইসেন্সভেদে ১৪ হাজার ৪৪০ থেকে ২০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও রাজধানীর অধিকাংশ বাস এখনো চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে চলছে বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ কাগজে নির্ধারিত মজুরি আর বাস্তব আয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।

শ্রমিক নেই, বাসও নামছে না

ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের হিসাবে প্রধান টার্মিনালগুলো ঘিরে প্রায় ১০ হাজার বাস চলাচল করে। এসব বাস পরিচালনায় চালক, সহকারী ও কন্ডাক্টর মিলিয়ে প্রয়োজন অন্তত ৬০ হাজার শ্রমিক।

ডিটিসিএর তথ্যেও রাজধানীর গণপরিবহনে বড় ব্যবস্থাপনা ঘাটতির চিত্র পাওয়া যায়। বৃহত্তর ঢাকায় সক্রিয় রুটের সংখ্যা প্রায় ৯০টি। এর মধ্যে ৬১টি রুটে ৪ হাজার ৬৪৫টি বাস চলাচলের তথ্য রয়েছে। সব রুট মিলিয়ে সক্রিয় বাসের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার হতে পারে বলে ধারণা ডিটিসিএ কর্মকর্তাদের।

কিন্তু বাসের সংখ্যা থাকলেই যে পরিবহন সচল থাকে না, শ্রমিক সংকট সেটিই এখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। ঠিকানা পরিবহনের মালিক বেলায়েত হোসেনের ভাষ্য, শতাধিক বাস থাকলেও কর্মীর অভাবে প্রতিদিন ৮০-৯০টির বেশি বাস নামানো যাচ্ছে না। আমিনবাজার থেকে আরিচা সড়কের বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকের অভাবে বাস অলস পড়ে থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ওয়েলকাম ট্রান্সপোর্টের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির ৪৫-৫০টি বাসের জন্য প্রয়োজনীয় চালক ও সহকারীর বড় অংশ পাওয়া যাচ্ছে না।

বাসের চাকরি কেন আকর্ষণ হারাচ্ছে

সমস্যাটি শুধু বেতন কম হওয়ার নয়। বাস শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও তাদের পেশা বদলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থাকা, প্রচণ্ড গরমে কাজ করা, বিশ্রামের অভাব, শৌচাগারের অনিশ্চয়তা এবং ছুটি নিলে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে বাসের চাকরি অনেক শ্রমিকের কাছে কঠিন হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে আছে যাত্রী সামলানোর চাপ এবং সড়কে প্রতিদিনের প্রতিযোগিতা। চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় মালিকের জমা পরিশোধের পর নিজের আয় নিশ্চিত করতে চালককে বেশি ট্রিপ দিতে হয়। বেশি ট্রিপ মানে বেশি যাত্রী ওঠানো, কম সময় থামা এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত গাড়ি চালানোর চাপ।

প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, রাজধানীর অনেক বাস এখনো ‘যত ট্রিপ, তত টাকা’ ধরনের ব্যবস্থায় চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি শ্রমিকের আয় যেমন অনিশ্চিত করে, তেমনি সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতারও জন্ম দেয়।

রিকশায় কেন এত আকর্ষণ

ব্যাটারিচালিত রিকশার সবচেয়ে বড় সুবিধা শ্রমিকদের কাছে তিনটি—আয়, স্বাধীনতা এবং নগদ টাকা। পুরো দিন চালালে প্রায় ২ হাজার টাকা এবং অর্ধদিবসে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মালিকানার ধরন, দৈনিক ভাড়া, চার্জ, গ্যারেজ খরচ ও স্থানীয় বিভিন্ন ব্যয় অনুযায়ী প্রকৃত আয় অবশ্য কমবেশি হয়।

কেউ নিজের রিকশা চালান, কেউ দৈনিক ভাড়ায় নেন। ফলে বড় অঙ্কের মূলধন ছাড়াও এ পেশায় ঢোকার সুযোগ রয়েছে।

ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি নিবন্ধন না থাকায় নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে এ ধরনের যান ১০-১২ লাখের মতো হতে পারে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে বলেও গবেষকদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে গণপরিবহনের জন্য নতুন চাপ। শ্রমিক যেখানে বাস থেকে বেরিয়ে রিকশায় যাচ্ছেন, সেখানে রিকশার সংখ্যা বাড়ছে দ্রুততর গতিতে।

শ্রমিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিরাপত্তা সংকট

ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার শুধু বাস শ্রমিকের পেশা বদলের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়ক নিরাপত্তা ও যানজটের প্রশ্নও।

নিবন্ধন, রুট, চালকের প্রশিক্ষণ এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সড়কে এসব যান হঠাৎ থামানো, লেন পরিবর্তন ও মূল সড়কে প্রবেশের কারণে বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

সাম্প্রতিক এক দুর্ঘটনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও সামনে এসেছে, যা এ যানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে আবারও আলোচনায় এনেছে। তবে পুরো বিষয়টিকে শুধু ‘রিকশা বনাম বাস’ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যাবে।

রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিই কি পথ দেখাবে?

ঢাকার বাস ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে রুটভিত্তিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধের কথা বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ডিটিসিএ বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকার রুট চিহ্নিত করেছে। পরিকল্পনায় কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা, জবাবদিহি এবং রুট পুনর্বিন্যাসের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

এই ব্যবস্থায় মালিকের হাতে আলাদা আলাদা বাস দিয়ে চালককে দৈনিক জমা তোলার চাপ দেওয়ার বদলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধীনে বাস পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে চালকের বেতন, কর্মঘণ্টা ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করার সুযোগও বাড়বে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসকে শুধু যান হিসেবে নয়, একটি পেশাগত সেবা হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। চালকের নির্ধারিত বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা কঠিন।

আসল সংকট বাসে নয়, ব্যবস্থাপনায়

ঢাকার গণপরিবহনের সামনে তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সামলাতে হবে, অন্যদিকে বাসের চাকরিকে শ্রমিকের কাছে আবারও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

শুধু রিকশা উচ্ছেদ করে বাস শ্রমিক ফিরিয়ে আনা যাবে না। কারণ শ্রমিক যে কারণে বাস ছেড়েছেন, সেই কারণগুলো যদি একই থাকে, তাহলে অন্য কোনো অনানুষ্ঠানিক পরিবহন খাত আবার তাদের টেনে নেবে।

অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, বাস শ্রমিকদের বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার ঘাটতিই পেশা বদলের বড় কারণ। তার মতে, বাস খাতকে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির আওতায় এনে নির্ধারিত বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা জরুরি।

অর্থাৎ ঢাকার রাস্তায় এখন যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেটি শুধু বাস আর ব্যাটারিচালিত রিকশার মধ্যে নয়। এটি আসলে নিশ্চিত আয়ের চাকরি বনাম অনিশ্চিত কিন্তু স্বাধীন আয়ের পেশার প্রতিযোগিতা।

বাসের স্টিয়ারিং ধরে ১৫-১৬ ঘণ্টা খেটেও যদি শ্রমিকের আয় অনিশ্চিত থাকে, আর রিকশার হ্যান্ডেলে বসে তুলনামূলক কম সময়ে নগদ আয় নিশ্চিত হয়, তাহলে শ্রমিক কেন বাসে থাকবেন—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। কারণ শ্রমিক সংকটকে উপেক্ষা করে শুধু নতুন বাস নামানো গেলেও, চালকের আসন খালি থাকলে সেই বাস শেষ পর্যন্ত রাস্তায় চলবে না।