রক্তচাপ মাপতে বসেছেন। হাতে কাফ বাঁধা হলো, যন্ত্র চালু হলো। কয়েক সেকেন্ড পর পর্দায় ভেসে উঠল একটু বেশি সংখ্যা। চিকিৎসকের কপালে ভাঁজ—‘চাপটা তো বেশি!’ অথচ রোগী হয়তো জানেনই না, রক্তচাপ বাড়ার পেছনে তাঁর শরীরের চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হাতটি কোথায় রাখা হয়েছিল।
রক্তচাপ মাপার সময় হাত শরীরের পাশে ঝুলিয়ে রাখা, কিংবা কোলে রেখে দেওয়ার মতো ছোটখাটো ভুলেই রিডিং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আসতে পারে। ফলে যাঁর প্রকৃতপক্ষে উচ্চ রক্তচাপ নেই, তিনিও ভুল করে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন। শুধু তাই নয়, ভুল রিডিংয়ের ওপর ভিত্তি করে শুরু হতে পারে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স মেডিসিনের এক গবেষণায় বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়েছে। গবেষকেরা ১৮ থেকে ৮০ বছর বয়সী ১৩৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের রক্তচাপ বিভিন্ন হাতের অবস্থানে মেপেছেন। দেখা গেছে, হাত শরীরের পাশে ঝুলিয়ে রাখলে সিস্টোলিক বা ওপরের রক্তচাপ গড়ে ৬.৫ mmHg এবং ডায়াস্টোলিক বা নিচের চাপ ৪.৪ mmHg পর্যন্ত বেশি দেখাতে পারে।
অর্থাৎ, যন্ত্রের সংখ্যা বাড়ছে—কিন্তু সব সময় রক্তচাপ যে সত্যিই ততটা বেড়েছে, তা নয়।
হাত ঝুললেই বিপত্তি
গবেষকদের মতে, হাত শরীরের পাশে ঝুলে থাকলে বাহুর পেশিতে কিছুটা টান তৈরি হতে পারে। এর প্রভাবে সাময়িকভাবে রক্তচাপের রিডিং বেড়ে যেতে পারে। আবার হাত কোলে রাখলেও সমস্যা হতে পারে। কারণ তখন হাতটি হৃদপিণ্ডের তুলনায় নিচে অবস্থান করে। ফলে রক্তচাপ মাপার সময় বাহু ও হৃদপিণ্ডের উচ্চতার পার্থক্য তৈরি হয়, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—রক্তচাপ মাপার সময় বাহু যেন টেবিল বা ডেস্কের ওপর আরাম করে রাখা থাকে এবং কাফের মাঝামাঝি অংশটি হৃদপিণ্ডের সমতলে থাকে।
পাঁচ মিনিটের অপেক্ষাও জরুরি
শুধু হাতের অবস্থান ঠিক রাখলেই হবে না। রক্তচাপ মাপার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট শান্তভাবে বসে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। পিঠে সমর্থন থাকতে হবে, দুই পা মেঝেতে সমতল রাখতে হবে এবং মাপার সময় কথা বলা বা অস্থিরতা এড়িয়ে চলতে হবে।
জনস হপকিন্সের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে দুই মিনিট হাঁটানো হয়েছিল—যেন তাঁরা সদ্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছেছেন। এরপর তাঁদের পাঁচ মিনিট বসিয়ে রেখে বিভিন্ন অবস্থানে একাধিকবার রক্তচাপ মাপা হয়। ফলাফলে হাতের অবস্থানের সঙ্গে রক্তচাপের সংখ্যার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
কয়েক সংখ্যার ভুল, বড় সিদ্ধান্তের ঝুঁকি
রক্তচাপের ক্ষেত্রে কয়েক মিলিমিটার পারদচাপের পার্থক্যও কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ নির্দিষ্ট সীমার ওপরে গেলে একজন ব্যক্তিকে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। ফলে ভুল পদ্ধতিতে পাওয়া একটি বেশি রিডিং কখনো কখনো ভুল রোগনির্ণয়ের দরজা খুলে দিতে পারে।
এনএইচএসের হিসাবে, উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ এমনকি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিকিৎসা বা ওষুধ দেওয়ার ঝুঁকিও কম নয়। তাই শুধু রক্তচাপ মাপাই নয়, সঠিকভাবে মাপাটাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এনএইচএসের এক চিকিৎসক ডিন এগিটের ভাষায়, রক্তচাপের সঠিক পরিমাপ রোগীর ঝুঁকি শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য। পরিমাপের পদ্ধতিতে ভুল থাকলে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে।
তাহলে রক্তচাপ মাপার সময় কী করবেন?
সহজ নিয়ম—চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন। পিঠে সমর্থন রাখুন। দুই পা মেঝেতে সমতল রাখুন। কয়েক মিনিট শান্ত থাকুন। এরপর বাহু টেবিলের ওপর এমনভাবে রাখুন, যাতে সেটি হৃদপিণ্ডের সমতলে থাকে। কাফ সঠিকভাবে বাহুতে লাগানো হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, একটি মাত্র রিডিং দেখেই সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোই ভালো। বারবার অস্বাভাবিক রিডিং এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ রক্তচাপের যন্ত্রটি হয়তো শুধু সংখ্যা দেখায়, কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে বসার ভঙ্গি, হাতের অবস্থান কিংবা কয়েক মিনিটের অস্থিরতা।
তাই পরেরবার রক্তচাপ মাপার আগে শুধু যন্ত্রের দিকে নয়—নিজের হাতের দিকেও একবার তাকিয়ে নিন। হাতটা ভুল জায়গায় থাকলে যন্ত্রও আপনাকে ভুল গল্প শোনাতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















