ঢাকা বাইপাস এশিয়ান হাইওয়েতে নির্মাণের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে সড়কটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কিলোমিটার অংশজুড়ে ফাটল ও দেবে যাওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, সড়কের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা না রাখার কারণে এ বিপর্যয় ঘটেছে। তবে প্রকল্প পরিচালক দায়ী করছেন টানা বৃষ্টি ও অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচলকে।
রোববার (৪ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, গাজীপুর-জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর সড়কের চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের সোনারগাঁয়ের সিংলাব-পাকুন্দা এলাকার আন্ডারপাসের পূর্ব পাশে সড়কের বিভিন্ন স্থানে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বি ফাটল তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও পিচ উঠে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভেতরের মাটি ও সুরকি। সড়কের কয়েকটি অংশ দেবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা।
শনিবার (৩ অক্টোবর) স্থানীয়রা প্রথম ফাটল দেখতে পান। দুর্ঘটনা এড়াতে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ওই অংশে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যানবাহন আটকে পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও চালকেরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন ঢাকা বাইপাস সড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ আসলাম আলী।
নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন
সড়কের এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে অনিয়ম এবং সড়কের দুই পাশ থেকে রাতের আঁধারে মাটি কেটে নেওয়ার কারণে ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, “রাস্তা বানানোর সময় আমরা চোখের সামনে দেখেছি কী নিম্নমানের কাজ হইছে! এক বছরও গেল না, এর মধ্যেই রাস্তা ফাইট্টা ধইসা পড়ল। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করতাছে, আর ঠিকাদাররা চুরি কইরা আমাগো জীবন ঝুঁকিতে ফালাইতাছে।”
সড়কের পাশের বাসিন্দা আল আমিনের অভিযোগ, নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু স্থানীয় ব্যক্তি রাতের আঁধারে সড়কের দুই পাশ থেকে মাটি কেটে বিক্রি করেছেন। এতে আশপাশের জায়গায় পুকুর ও গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় গাইডওয়াল নির্মাণ না করেই তাড়াহুড়ো করে সড়কের কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে দুই পাশের মাটি সরে গিয়ে সড়কটি দেবে পড়েছে।
আল আমিন বলেন, আরও বৃষ্টি হলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এতে যানবাহন চলাচল ও মানুষের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তবে এলাকাবাসীর এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃষ্টিকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ
নির্মাণকাজের মান ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ আসলাম আলী বলেন, টানা দুই থেকে তিন দিনের বৃষ্টিতে সড়কের নিচের মাটি নরম হয়ে যায়। এর ওপর দিয়ে অনবরত অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচল করায় মাটি সরে গিয়ে সড়ক দেবে গেছে এবং ফাটল দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, প্রকল্পের বেসরকারি অংশীদার ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ডাইভারশন সড়ক তৈরি করে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে ড্রিল করে দ্রুত সড়ক মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তদন্ত চান এলাকাবাসী
সড়কটি দ্রুত মেরামতের পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। তাদের মতে, শুধু সাময়িক মেরামত করে যান চলাচল স্বাভাবিক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সড়কের নির্মাণমান, মাটি অপসারণ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাকাঠামো যথাযথভাবে করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের একটি বড় অংশে ফাটল ও দেবে যাওয়ার ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল বৃষ্টি ও ভারী যানবাহনের প্রভাব, নাকি নির্মাণগত ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনাও এর জন্য দায়ী? তদন্তের মাধ্যমে সেই প্রশ্নের জবাব পাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন জরুরি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















