ঢাকার বস্তিতে বসবাস করা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঘরভাড়া দেওয়াই শেষ চাপ নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা পেতেও তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। সরকারি সরবরাহব্যবস্থা থেকে সেবা এলেও তার নিয়ন্ত্রণ অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সিন্ডিকেটের হাতে। ফলে নির্ধারিত শুল্কের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতে হচ্ছে হাজারো পরিবারকে। রাজধানীর কড়াইল, কল্যাণপুর পোড়া ও ভাসানটেক বস্তিতে এমন অনানুষ্ঠানিক সেবা-বাণিজ্যের চিত্র উঠে এসেছে বাসিন্দা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে।
মিটার সরকারি, নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেটের
কড়াইল বস্তির গৃহকর্মী জান্নাত বেগমের এক কক্ষের ঘরে একটি বাতি ও একটি পাখা। এ দুটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্যই মাসে ৬০০ টাকা দিতে হয় তাকে। অথচ সরকারি শুল্কহার অনুযায়ী, তার বিদ্যুৎ ব্যবহারের আনুমানিক খরচ ৪৫০ টাকার কম হওয়ার কথা। এর বাইরে ঘরভাড়া পাঁচ হাজার টাকা, পানির জন্য ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং এক চুলার গ্যাসের জন্য মাসে ৫০০ টাকা দিতে হয়।
জান্নাতের মতো অনেক বস্তিবাসীর নিজস্ব বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব ও সংযোগ পাওয়ার জটিলতায় তাদের নির্ভর করতে হয় যৌথ মিটার কিংবা অনানুষ্ঠানিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর। আর এই নির্ভরশীলতাকেই পুঁজি করে কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন কড়াইল বস্তিতে প্রায় ১৭ হাজার পরিবার বসবাস করে। ভাসানটেক বস্তিতে পরিবারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার, আর কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে তিন হাজারের বেশি। তিনটি বস্তিতেই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ এবং মূল্য আদায় নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
ডেসকোর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য, একটি প্রধান মিটারের মাধ্যমে একটি বস্তিতে সর্বোচ্চ ২০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ দেওয়া যেতে পারে। তবে বাস্তবে কোনো কোনো মিটারের আওতায় শত শত পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কড়াইলে জামাল বাদশা নামের এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি মিটারের মাধ্যমে ১৭৯টি পরিবারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জামাল অবশ্য বলেছেন, তার ১৩৯ জন গ্রাহকের সাবমিটার রয়েছে; বাকি ৪০ জনকে সরাসরি লাইন থেকে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাবমিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ইউনিটপ্রতি ১৩ টাকা এবং অন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতিটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের জন্য ২৫০ টাকা নেওয়া হয়। অথচ ২০২৬ সালের জুনের একটি ডেসকো বিলের অনুলিপিতে দেখা গেছে, তিনি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৭ টাকা ৪৭ পয়সা পরিশোধ করেছেন।
কল্যাণপুর পোড়া বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখানে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণাধীন সংযোগে ইউনিটপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ টাকা দিতে হয়। বস্তিতে বেড়ে ওঠা জনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু সময়ের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ১২ টাকায় নেমে এলেও পরে আবার বেড়েছে।
সিন্ডিকেটের হয়ে বিল সংগ্রহকারী জুয়েল হোসেন বিল্লাল জানিয়েছেন, তারা প্রতি ইউনিটে ১৭ টাকা নেন। ডেসকোর কাছ থেকে কর ছাড়া প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৯ টাকা ৭৫ পয়সায় কেনা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
গ্যাস-পানিতেও বাড়তি মাশুল
বিদ্যুতের পাশাপাশি কড়াইল বস্তিতে গ্যাস ও পানির সংযোগ নিয়েও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। বাসিন্দাদের দাবি, এক চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়।
জামাল বাদশা জানিয়েছেন, তিনি প্রায় ৫০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন। তার দাবি, গ্যাসের জন্য আদায় করা টাকা শাহাবুদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে দেন, যিনি লাইন নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে শাহাবুদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে কেবল একজন কর্মী বলে দাবি করেছেন।
পানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র। ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক, দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় কড়াইলে প্রায় দেড় হাজার মিটারযুক্ত পানির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু স্থানীয় গোষ্ঠী এসব সংযোগ থেকে অবৈধভাবে পাইপ টেনে বিভিন্ন পরিবারে পানি সরবরাহ করে অর্থ আদায় করছে।
জামাল বাদশার ভাষ্য, তিনি ৪০টি পরিবারকে মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে পানি সরবরাহ করেন। পোশাকশ্রমিক কাঞ্চনা বেগম বলেন, তিন সদস্যের পরিবারে পানির ব্যবহার কম হলেও মাসে ৩০০ টাকা দিতে হয়।
ঢাকা ওয়াসার মাঠ কর্মকর্তা নয়ন সরকার স্বীকার করেছেন, কিছু সংযোগধারী বস্তিতে অবৈধভাবে পানি সরবরাহ করে লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। তার মতে, মিটারযুক্ত লাইন থেকে পানি নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কথা নয়।
নজরদারির ঘাটতি, সমাধান কোথায়
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্যে সমস্যার জটিলতা স্পষ্ট। ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সব পরিবারের জন্য মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। তবে এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেছেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো বারবার সেগুলো পুনঃসংযোগ দেয়। তিতাসের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারেন বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। তার মতে, শুধু তিতাসের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সামাজিক ও বস্তি উন্নয়ন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মামুন উল হাসান জানিয়েছেন, বস্তিবাসীদের নতুন ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে তাদের নেই। এ বিষয়ে সরকার নীতি বা আইনি কাঠামো তৈরি করলে সিটি করপোরেশন তা অনুসরণ করবে।
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ সালমা এ শফির মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের বসতি নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। জনসংখ্যা বাড়লেও নিরাপদ ও বৈধ সেবার ব্যবস্থা না থাকায় বাসিন্দারা বাড়তি খরচে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামানও মনে করেন, সরকার পরিবর্তন হলেও বস্তিতে সেবা সরবরাহের বিদ্যমান ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্তিবাসীদের বৈধ সংযোগের আওতায় আনা, পরিবারভিত্তিক মিটার স্থাপন, নিয়মিত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এতে একদিকে যেমন অননুমোদিত সেবা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বাসিন্দারাও ন্যায্য মূল্যে নিরাপদ সেবা পাবেন।
মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও বস্তিবাসীদের কেন বাড়তি অর্থ দিতে হবে—এ প্রশ্নের সমাধান শুধু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ হবে বৈধ, সাশ্রয়ী এবং জবাবদিহির আওতাধীন।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















