রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে এক মুহূর্তের অসতর্কতাই কেড়ে নিতে পারে জীবন। অথচ প্রতিদিন সেই ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হচ্ছেন হাজারো মানুষ। কেউ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কেউ কর্মস্থলে ছুটছেন, কেউবা প্রয়োজনের তাগিদে বের হয়েছেন ঘর থেকে। চারপাশে বাস, লেগুনা, অটোরিকশা ও রিকশার অবিরাম চলাচল। যানবাহনের ফাঁক গলে রাস্তা পার হওয়ার এই দৃশ্য রাজধানীর রামপুরা ব্রিজ এলাকায় প্রতিদিনের বাস্তবতা। গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগস্থলে পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?
রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা ও খিলগাঁও এলাকার মানুষের যাতায়াতে রামপুরা ব্রিজের গুরুত্ব অনেক। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু যানবাহনের চাপের তুলনায় পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে সড়ক পার হতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
যানবাহনের ফাঁকে জীবনের ঝুঁকি
সড়কের দুই পাশের মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন থাকলেও নিরাপদ পারাপারের সুযোগ সীমিত। ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, যত্রতত্র থামানো গাড়ি এবং সড়কে বিশৃঙ্খল চলাচল পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য পথচারীদের অনেক সময় যানবাহনের ফাঁক খুঁজতে হয়। এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে গিয়ে মাঝপথে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার ঘটনাও ঘটে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, নারী এবং শারীরিকভাবে চলাচলে অসুবিধা রয়েছে এমন মানুষ। দ্রুতগতির যানবাহনের মধ্যে দিয়ে তাঁদের রাস্তা পার হওয়া বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। সামান্য অসতর্কতা কিংবা চালকের হঠাৎ গতি পরিবর্তনও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
শুধু দুর্ঘটনার আশঙ্কাই নয়, যানজটের সময় সড়ক পার হতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হওয়ায় মানুষের মূল্যবান সময়ও নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছানো, কর্মজীবী মানুষের সময়মতো অফিসে যাওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে গন্তব্যে পৌঁছানো—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
ফুটওভার ব্রিজই কি সমাধানের পথ?
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারীদের দাবি, রামপুরা ব্রিজের দুই পাশে পথচারীদের চলাচলের ধরন, যানবাহনের চাপ এবং আশপাশের সড়কের সংযোগ বিবেচনা করে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে পথচারীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কে যানবাহন চলাচলও আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু কাঠামো তৈরি করলেই চলবে না। কোথায় এটি নির্মাণ করা হলে সবচেয়ে বেশি মানুষ উপকৃত হবেন, দুই পাশের প্রবেশপথ কতটা সহজ হবে এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কীভাবে এটি ব্যবহার করবেন—এসব বিষয়ও পরিকল্পনায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে র্যাম্প বা অন্যান্য সহজ প্রবেশব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে গণপরিবহনের নির্ধারিত স্টপেজ কার্যকর করা, সড়কের ওপর যত্রতত্র গাড়ি থামানো নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন জরুরি। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পথচারী ও যানবাহনের চলাচল ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের
রামপুরা ব্রিজ এলাকার সমস্যার কার্যকর সমাধানে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। প্রথমে এলাকাটির যানবাহনের চাপ, পথচারীদের চলাচল, পারাপারের প্রয়োজনীয়তা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে সরেজমিন মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ কিংবা অন্য কোনো নিরাপদ পারাপারব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের হলেও তাঁরা এখনো কাঙ্ক্ষিত সমাধান দেখতে পাননি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা বা প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা প্রয়োজন।
নিরাপদ পারাপার কি অধরাই থাকবে?
একটি আধুনিক রাজধানীর সড়কব্যবস্থায় যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচলের পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ যে সড়ক ব্যবহার করেন, সেখানে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা নগর ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য দায়িত্ব।
রামপুরা ব্রিজে পথচারীদের ভোগান্তি কমাতে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান উদ্যোগ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা। পাশাপাশি পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানো ও ট্রাফিক আইন কার্যকর করাও জরুরি।
প্রশ্ন তাই শুধু একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের নয়; প্রশ্ন মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার। প্রতিদিনের ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে রামপুরা ব্রিজকে পথচারীবান্ধব করে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এখন সেই অপেক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারীরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















