ঢাকার যানজটে আটকে থাকা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা সময় নয়। সময় তো এমনিতেই আটকে থাকে। বড় সমস্যা হলো—চারপাশে কী বলা হচ্ছে, তা বোঝা।
বিশেষ করে বাসের হেলপার যখন হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠেন—
‘ওস্তাদ, বামে প্লাস্টিক!’
নতুন যাত্রী জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভাবেন, প্লাস্টিক আবার বামে এল কোথা থেকে?
পরক্ষণেই—
‘ডাইনে টেসলা!’
এবার তিনি আরও বিভ্রান্ত। ঢাকার রাস্তায় টেসলা!
দেশে বিদ্যুৎ নিয়ে এত আলোচনা, আর টেসলা এসে হাজির ঢাকার যানজটে—বিষয়টি যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।
পাশের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি শান্তভাবে বললেন,
—‘টেসলা ওই যে, রিকশা।’
এবার যাত্রীর মাথায় হাত।
রিকশা টেসলা হলে প্লাস্টিক আবার কী?
উত্তর—ব্যক্তিগত গাড়ি।
অর্থাৎ ঢাকার যানজটে গাড়ির নাম গাড়ি নয়, রিকশার নাম রিকশা নয়। এখানে সবকিছুরই নতুন পরিচয় আছে। শুধু সেই পরিচয়পত্রটি বাসের হেলপার ছাড়া আর কেউ দেখেনি।
‘সামনে ক্লিয়ার’—কিন্তু কতটা ক্লিয়ার?
ঢাকার আরেক বিখ্যাত বাক্য—‘সামনে ক্লিয়ার!’
এই কথা শুনে নতুন যাত্রী যদি মনে করেন সামনে রাস্তা ফাঁকা, তাহলে বুঝতে হবে তিনি ঢাকার যানজটে নতুন।
পুরোনোরা জানেন, ‘ক্লিয়ার’ বলতে সামনে এক চিলতে জায়গা দেখা গেছে। সেই জায়গায় বাস ঢুকবে কি না, সেটা পরের বিষয়। আগে ঘোষণা দিতে হবে।
কারণ ঢাকার রাস্তায় জায়গা দেখা দেওয়া আর জায়গা পাওয়া—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
এক ইঞ্চি ফাঁকা জায়গা দেখা গেলেই সেটির দাবিদার হয়ে যায় কয়েকটি বাস, রিকশা, সিএনজি ও মোটরসাইকেল।
কেউ জায়গাটি পেলে সেটি তার সৌভাগ্য। আর না পেলে পাশের গাড়িকে দোষ দেওয়া যায়—এটিও কম সুবিধার নয়।
‘বরাবর’—এক শব্দে এত নির্দেশ!
‘বরাবর’ শব্দটি ঢাকার যানজটে এক ধরনের বহুমুখী নির্দেশনা।
হেলপার বললেন, ‘বরাবর!’
মানে সামনে যান। থামবেন না। ডানে জায়গা পেলে ডানে, বাঁয়ে জায়গা পেলে বাঁয়ে। রাস্তা সরু হলেও সমস্যা নেই।
রাস্তা একেবারেই না থাকলে?
সেটা চালক ও হেলপারের পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়।
ঢাকার যানজটে যুক্তি অনেক সময় বিলাসিতা। এখানে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস।
এই ভাষার কোনো স্কুল নেই
‘প্লাস্টিক’, ‘টেসলা’, ‘বরাবর’, ‘সামনে ক্লিয়ার’—এসব শেখার জন্য কোনো কোর্স করতে হয় না।
ঢাকার রাস্তাই শিক্ষক। যানজটই পাঠ্যবই।
নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ নানা এলাকা থেকে আসা হেলপারদের আঞ্চলিক ভাষা আলাদা। কিন্তু কয়েক দিন ঢাকার রাস্তায় কাটালেই তাদের শব্দভান্ডারে নতুন কিছু শব্দ যোগ হয়।
কারণ এখানে দীর্ঘ বাক্যের আয়ু খুব কম।
‘ওই গাড়িটার ডান পাশ দিয়ে সাবধানে সামনে যাও’—এত কথা বলার সময় নেই।
তার বদলে—
‘ডাইনে! প্লাস্টিক!’
দুই শব্দে কাজ শেষ।
চালক বুঝলেন।
হেলপার বুঝলেন।
যাত্রী বুঝলেন না।
তবু বাস এগিয়ে গেল।
ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার সাফল্য সম্ভবত এখানেই।
রিকশাও কথা বলে
মানুষের চিৎকারে জায়গা না পেলে রিকশা তার নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে—ক্রিং ক্রিং।
একবার বেল—‘আমি আছি।’
দুবার—‘আমি একটু কাছে আছি।’
তিনবার—‘আমি এতটাই কাছে যে, আপনি না সরলে আমাদের সম্পর্কটা আর বন্ধুত্বপূর্ণ থাকবে না।’
অবশ্য রিকশাচালক এসব বলেন না। বেলই সব বলে দেয়।
নতুন পথচারী বেল শুনে আগে পেছনে তাকান। তারপর ডানে-বাঁয়ে তাকান। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন, রিকশাটি তাঁর গায়ের পাশ দিয়েই যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ব্যাকরণ নয়, গন্তব্যই শেষ কথা
ঢাকার এই সাংকেতিক ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর কোনো ব্যাকরণ নেই, কিন্তু ব্যবহারিক দক্ষতা আছে।
কে কোথা থেকে এসেছে, কোন অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে—এসব এখানে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, চিৎকারটি যেন হর্ন, বেল আর যানজটের সম্মিলিত শব্দ পেরিয়ে চালকের কানে পৌঁছায়।
তাই ঢাকার রাস্তায় ভাষাও ছোট হয়েছে।
‘প্লাস্টিক’ মানে গাড়ি।
‘টেসলা’ মানে রিকশা।
‘বরাবর’ মানে এগিয়ে যান।
‘সামনে ক্লিয়ার’ মানে—আশা এখনো শেষ হয়নি।
আর তিনবার ‘ক্রিং ক্রিং’?
তার অর্থ খুব সহজ—
ভাই, দর্শন পরে করবেন। আগে একটু সরে দাঁড়ান।
ঢাকার যানজট হয়তো মানুষকে দ্রুত কোথাও পৌঁছে দেয় না। তবে একটি বিষয়ে শহরটি সফল—এটি মানুষকে এমন এক ভাষা শিখিয়েছে, যার জন্য কোনো অভিধান লাগে না।
শুধু ঢাকার রাস্তায় কিছুদিন আটকে থাকলেই হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















