বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা বাড়তে থাকায় দীর্ঘ ১৪ মাস পর আবারও ডলার বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে ডলারের ওপর তৈরি হওয়া বাড়তি চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহের এই উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছিল। এতে রিজার্ভও বাড়ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক বাজারে আজ মঙ্গলবার প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা। আগের দিন এ হার ছিল ১২৩ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে ডলারের গড় দাম বেড়েছে ১৫ পয়সা।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের আমদানি ব্যয়ে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশের আমদানি ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।
জুলাইয়ে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে দেশের ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে রপ্তানি আয় কিছুটা কমেছে। জুলাইয়ে দেশের রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও কিছুটা বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১১ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে এ ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রির সিদ্ধান্তকে গত ১৪ মাসের নীতির পরিবর্তন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রির পরিবর্তে উল্টো ডলার কিনেছে। দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ কমে আসায় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ১৪ মাসে বাজার থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এখন বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়ায় সেই ডলার বিক্রি করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজারে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বা কমলে এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ভালো অবস্থায় রয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কতটা চাপ তৈরি করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় আরও বাড়লে ডলারের চাহিদাও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও সক্রিয় হতে হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে রিজার্ভের অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী হলেও আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের গতিপথের ওপর নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে ডলারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ের চাপও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় বাজারে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















