ইলিশের দেশ বাংলাদেশ এখন ভারত থেকে আনছে ইলিশ। দীর্ঘদিনের পরিচিত বাণিজ্যচিত্রের ঠিক উল্টো এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে, বাংলাদেশে কি তবে ইলিশ ফুরিয়ে আসছে? ভারত কি এখন বাংলাদেশের চেয়েও বেশি ইলিশ উৎপাদন করছে? কয়েক শ টন আমদানিতে কি দেশের চাহিদা মিটবে, আর দামই বা সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে কতটা?
তথ্য বলছে, ভারত থেকে ইলিশ আমদানির অর্থ এই নয় যে উৎপাদনে ভারত বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে; বরং বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে এখনো বাংলাদেশই শীর্ষে।
তবে বাজারে দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিতই থাকছেন অনেক ভোক্তা।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। পরের বছর তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ টনে।
অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব এখনো প্রকাশিত না হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের নিচেই থাকতে পারে।
ভারতের সামগ্রিক মাছ উৎপাদন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি হলেও ইলিশের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশে আহরিত হয়। ফলে ভারত থেকে কয়েক শ টন ইলিশ আসাকে উৎপাদনের নেতৃত্ব বদলে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ভারতের গুজরাটে সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের একটি অস্বাভাবিক ভালো মৌসুম তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে গুজরাট থেকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে চার হাজার টনের বেশি ইলিশ গেছে বলে ব্যবসায়ী ও জেলেদের তথ্য রয়েছে। নর্মদায় বেশি বৃষ্টির কারণে মিঠাপানির প্রবাহ বেড়ে মোহনার লবণাক্ততা কমে যাওয়াকে সেখানে ইলিশ বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে দেখছেন ভারতীয় মৎস্য কর্মকর্তারা।
কত ইলিশ এসেছে, ৩৫৩ নাকি ৫০০ টন?
এখানেই হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারাক রয়েছে। ভারতীয় মাছ ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি, গত দুই-তিন মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ পাঠানো হয়েছে এবং আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দরের সরকারি কোয়ারেন্টাইন তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে বেনাপোল দিয়ে এসেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৩৫৩ টন ইলিশ। জুলাইয়ে আমদানি ছিল মাত্র ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি, আগস্টে তা বেড়ে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি হয়েছে।
ফলে এখন পর্যন্ত ‘৫০০ টন’কে ব্যবসায়ীদের দেওয়া সামগ্রিক হিসাব হিসেবে দেখা নিরাপদ; আর বেনাপোল দিয়ে নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত আমদানির পরিমাণ প্রায় ৩৫৩ টন। অন্য কোনো বন্দর বা পথে আসা চালান যোগ হলে মোট পরিমাণ বেশি হতে পারে।
আরেকটি জটিলতাও আছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা মাছের বড় অংশ গুজরাটের বলে দাবি করলেও যশোরের কয়েকজন ব্যবসায়ীর ভাষ্য, কিছু মাছ মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসছে। তাই আমদানি করা সব ইলিশই ভারতে উৎপাদিত, এমন সিদ্ধান্তেও এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না।
কেন কমছে বাংলাদেশের ইলিশ
উৎপাদন কমার পেছনে শুধু একটি কারণ নেই। নদী ভরাট ও নাব্যতা হ্রাস, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি ও পানির প্রবাহে পরিবর্তন, সাগর ও মোহনায় অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জাটকা ও প্রজননক্ষম ইলিশ নিধনকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। মৎস্য কর্মকর্তারাও বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু উৎপাদন নয়, ধরা পড়া ইলিশের গড় আকারও কমছে।
ইলিশ পরিযায়ী মাছ। সাগর থেকে নদীতে এসে ডিম ছাড়ার পুরো যাত্রাপথে পানির প্রবাহ, লবণাক্ততা ও নদীর গভীরতার সামান্য পরিবর্তনও এর চলাচলে প্রভাব ফেলে। ফলে একটি মৌসুমে খারাপ আবহাওয়া বা অনিয়মিত বৃষ্টিও বাজারে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে।
৫০০ টনে কি চাহিদা মিটবে?
সোজা উত্তর, না। বাংলাদেশের বার্ষিক ইলিশ উৎপাদন যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ টন, সেখানে ৫০০ টন হলো তার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কাছাকাছি। এমনকি আরও ২০০ টন এলেও মোট ৭০০ টন হবে বার্ষিক দেশীয় উৎপাদনের প্রায় শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ।
অর্থাৎ এ আমদানি জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি পূরণের সমাধান নয়। তবে যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম বা সীমান্তসংলগ্ন কিছু বাজারে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়াতে এবং দেশি ইলিশের ওপর চাপ কমাতে পারে।
দাম কি সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে?
এখানেও আশাবাদ সীমিত। আগস্টের শেষ দিকে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ কেজিপ্রতি ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, এক কেজির কাছাকাছি মাছ ২ হাজার ২৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং বড় ইলিশ ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
তবে বিদেশি ইলিশ কিছু বাজারে অনেক সস্তা। যশোরে ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৩ কেজির দেশি ইলিশ যেখানে কেজিপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা, সেখানে আমদানি করা ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
তাই আমদানিতে একটি সস্তা বিকল্প তৈরি হচ্ছে, কিন্তু কয়েক শ টন মাছ দিয়ে সারা দেশের বাজারদর ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। ইলিশ সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে হলে আমদানির চেয়ে বেশি জরুরি দেশীয় উৎপাদন ঘুরিয়ে দাঁড় করানো, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা ও পরিবেশ রক্ষা এবং আহরণ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা।
ভারত থেকে ইলিশ আসার ঘটনাটি তাই বাংলাদেশের উৎপাদনক্ষমতা হারানোর ঘোষণা নয়; বরং একটি সতর্কসংকেত। বিশ্বের শীর্ষ ইলিশ উৎপাদক দেশকেই যদি মৌসুমে নিজের বাজার সামাল দিতে আমদানির দিকে তাকাতে হয়, তবে সমস্যাটা শুধু মাছের নয়, পুরো ইলিশ ব্যবস্থাপনার।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























