দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংকট ক্রমেই আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে এসব ব্যাংকে।
সংকটে থাকা এই ১০ ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
খেলাপি ঋণের পরিমাণে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। ছয় মাসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানান, খেলাপি ঋণের বড় অংশ এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ঋণ আদায়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। চলতি বছর পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ থেকে ৭৪৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বড় কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকটির বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে আছে। মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছে রয়েছে বলে তারা জানান।
রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ।
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৯৭ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বা ৭৮ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৯৬ শতাংশ।
এ ছাড়া এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৫৬ দশমিক ০৪, ৬৫ দশমিক ৪৬ ও ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলামের মতে, কয়েকটি ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের সংকট বেশি কেন্দ্রীভূত। অল্প কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিপুল ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়াকে তিনি খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট। বাকি অংশের পেছনে রয়েছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতি। সংকট কাটাতে বড় ঋণগ্রহীতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















