দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের সেবার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জুলাই মাসের নেটওয়ার্ক কার্যকারিতা মূল্যায়নে বেশিরভাগ অপারেটরকে নির্ধারিত মানদণ্ডের মধ্যে পেলেও অপারেটরদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে কমিশনের নিজস্ব পরিমাপের বেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে মোবাইল সেবার প্রকৃত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
মূল্যায়নের আওতায় ছিল দেশের চার মোবাইল অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক। চার বছরেরও বেশি সময় পর এবারই প্রথম বিটিআরসি জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একই সঙ্গে নেটওয়ার্কের মান যাচাই করেছে। তবে প্রচলিত ড্রাইভ টেস্টের পরিবর্তে এবার কমিশনের টেলিকম মনিটরিং সিস্টেমের (টিএমএস) তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিএমএস ও ড্রাইভ টেস্টের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এক নয়। কোন এলাকায় কত নমুনা নেওয়া হচ্ছে, নেটওয়ার্ক কাভারেজ ও গ্রাহকসংখ্যা কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। ফলে শুধু টিএমএসের তথ্য দিয়ে অপারেটরদের তুলনা করলে বাস্তব গ্রাহক অভিজ্ঞতার পুরো চিত্র পাওয়া নাও যেতে পারে।
মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা দেখা গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের ক্ষেত্রে। জুলাইয়ে ফোর-জি নেটওয়ার্কের রেডিও রিসোর্স কন্ট্রোল (আরআরসি) সফলতার হার ছিল ৯৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যেখানে নির্ধারিত মান ৯৯ শতাংশ। ডেটা নন-রিটেইনেবিলিটি হারও নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল। ৬৪টি পরিমাপ করা উপজেলার মধ্যে মাত্র ১২টিতে আরআরসি সফলতার হার নির্ধারিত মান পূরণ করেছে। উপজেলা পর্যায়ে ৫৩৭টি পরিমাপের মধ্যে মাত্র ১৩৬টি মানদণ্ড পূরণ করে।
এদিকে টেলিটকের মূল ডেটা বা বাইনারি ফাইল অসম্পূর্ণ থাকায় বিটিআরসি অপারেটরটির দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে ফোর-জি ডাউনলোড গতি গড়ে ১১ দশমিক ২০ এমবিপিএস পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৫০ এমবিপিএসের চেয়ে অনেক বেশি।
গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রেও কমিশনের পরিমাপ ও অপারেটরের তথ্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ভিওএলটিই কল ড্রপের হারে ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিটিআরসির পরিমাপে হার দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ, যেখানে গ্রামীণফোনের দেওয়া তথ্য ছিল শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ। তবে উভয় ফলই নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে।
রবির ক্ষেত্রেও তথ্য যাচাইয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অপারেটরটির ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের মূল ডেটা না থাকায় সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বিটিআরসি। কমিশনের পরিমাপে রবির গড় ফোর-জি ডাউনলোড গতি ছিল ৬ দশমিক ৮৫ এমবিপিএস। রবি অবশ্য জানিয়েছে, শুধু টিএমএসের তথ্যের ভিত্তিতে অপারেটরদের তুলনা করলে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলালিংকের ক্ষেত্রে বিটিআরসির পরিমাপ ও অপারেটরের দেওয়া তথ্যের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম ব্যবধান পাওয়া গেছে। তবে বান্দরবানসহ কয়েকটি এলাকায় নেটওয়ার্ক সেবায় ঘাটতি রয়েছে। ছয়টি উপজেলায় টু-জি ও ফোর-জি উভয় নেটওয়ার্কেই ‘নো সার্ভিস’ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মোবাইল সেবার মান যাচাইয়ে শুধু গড় পরিসংখ্যান নয়, অঞ্চলভিত্তিক নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি, গ্রাহকসংখ্যা, ট্রাফিক, কাভারেজ ও নির্ভরযোগ্য কাঁচা ডেটাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গেলে গ্রাহকদের কাছে মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রকৃত মান আরও স্পষ্ট হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা 























