পুলিশের মনোবল এখন আর বড় সংকট নয়; মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যানবাহন ও লজিস্টিক সংকট। পুলিশের বহরে থাকা বিপুলসংখ্যক যানবাহনের বড় অংশ পুরোনো বা অচল। এর সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের ঘাটতি। ফলে অপরাধ দমন, টহল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশের যানবাহন ও জনবল সংকট দ্রুত নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সম্প্রতি কমিটির বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
১৬,২০০ গাড়ির বহরে বড় অচলাবস্থা
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের বহরে মোট ১৬ হাজার ২০০টি যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৭৮৭টি মোটরসাইকেল। তবে এসব মোটরসাইকেলের মাত্র ৫ হাজার ৫০৩টি সচল রয়েছে।
অর্থাৎ পুলিশের মোটরসাইকেল বহরের প্রায় অর্ধেকই এখন ব্যবহারের বাইরে।
চার চাকার হালকা ও ভারী যানবাহনের অবস্থাও নাজুক। পুলিশের বহরে থাকা ৬ হাজার ৫৫৮টি চার চাকার যানবাহনের বয়স আট বছরের বেশি। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব গাড়ির একটি বড় অংশের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে।
২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন গাড়ি কেনা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৪৯টি। ফলে পুরোনো ও অচল গাড়ির জায়গায় নতুন যানবাহন যুক্ত হওয়ার হার প্রয়োজনের তুলনায় কম।
প্রতি থানায় গাড়ির ঘাটতি
পুলিশের থানাভিত্তিক কার্যক্রমেও যানবাহনের সংকট স্পষ্ট। প্রতিটি থানায় দুটি করে সিঙ্গেল-কেবিন পিকআপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ২ হাজার ৬৫৬টি পিকআপের ঘাটতি রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় অনেক এলাকায় নিয়মিত টহল পরিচালনা, আসামি গ্রেপ্তার, ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।
গাড়ি থাকলেও নেই পর্যাপ্ত জ্বালানি
শুধু যানবাহন কেনা নয়, সেগুলো সচল রাখার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় সংকট। বৈঠকে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি তেলের ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, একটি থানায় স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ যানবাহন ও জ্বালানি বরাদ্দ থাকে, তা দিয়ে পুরো থানা এলাকা কার্যকরভাবে কাভার করা সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া পুলিশের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য স্থায়ী ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নিজেদের অর্থ ব্যয় করতে হয় বলেও বৈঠকে অভিযোগ করা হয়।
মনোবল নয়, এখন বড় সমস্যা লজিস্টিক
বৈঠকে পুলিশের মনোবল নিয়েও আলোচনা হয়। জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যে মানসিক ট্রমা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—তা জানতে চান সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জানান, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব কাটাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। তবে বর্তমানে মনোবল বড় সমস্যা নয়; প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতিই বড় চ্যালেঞ্জ।
৬৫ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট
পুলিশের যানবাহন সংকট মোকাবিলায় উন্নয়ন বাজেট থেকে ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। এ অর্থ দিয়ে যানবাহন কেনার পাশাপাশি থানা নির্মাণ ও স্পিডবোট কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জানান, জুলাই আন্দোলনে পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পর্যায়ক্রমে সেগুলো প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গত অর্থবছরে ২৭২টি গাড়ি কেনার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব গাড়ি নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন
বৈঠকে জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়নের বিষয়টিও উঠে আসে। সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা অভিযোগ করেন, আন্দোলনে বিতর্কিত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর নির্বাচনী এলাকা নরসিংদী এবং ঢাকার আশপাশের থানায় পদায়িত হচ্ছেন।
তিনি এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরে বিষয়টি সুপারিশ আকারে পাঠায় কমিটি।
২০২৫ সালে হাজারো অপরাধ
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা ২০২৫ সালের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি চিত্রও তুলে ধরেন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে দেশে ৭০২টি ডাকাতি, ১ হাজার ৯৩৫টি দস্যুতা, ৩ হাজার ৭৮৮টি খুন, ৬৬টি দাঙ্গা, ৩ হাজার ২৩২টি ধর্ষণ এবং ৭টি অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত যানবাহন ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
জরুরি প্রকল্পের তাগিদ
বৈঠকের সার্বিক আলোচনা শেষে পুলিশের তীব্র যানবাহন সংকট নিরসনে অতি দ্রুত একটি প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে শুধু জনবল নিয়োগ কিংবা প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সচল যানবাহন, পর্যাপ্ত জ্বালানি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য লজিস্টিক সরঞ্জাম। এসব ঘাটতি দ্রুত পূরণ না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া কঠিন হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















