পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার ইমরান খানকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খান।
রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী ইমরানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে কথা বলতে পারেননি তারা। গত মার্চে ঈদুল ফিতরের সময় মাত্র ২০ মিনিটের ফোনালাপই ছিল বাবার সঙ্গে তাদের সর্বশেষ কথা।
লন্ডনে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুই ছেলে অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের একাকী কারাবাস, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে ইমরানের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের দাবি, ইমরান নিয়মিত চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং তার স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়ানো খবর সত্য নয়।
২৭ বছর বয়সী কাসিম খান বলেন, বাবার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সাধারণত ২০ মিনিটের মতো। কখন সেই সময় শেষ হয়ে যাবে, তা তারা আগে থেকে জানেন না। ওই অল্প সময়ের মধ্যেই ইমরান তাদের জীবন, ভবিষ্যৎ ও নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন। কিন্তু বাবার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
কাসিমের ভাষায়, বাবা শুধু বলেন, ‘যা হওয়ার, তাই হচ্ছে।’
ইমরান খান ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একের পর এক মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ২০২৩ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ঘুষ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস এবং রাষ্ট্রীয় উপহার অবৈধভাবে বিক্রিসহ ১০০টির বেশি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। ইমরান এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তার অধিকাংশ সাজা স্থগিত বা বাতিল হলেও একটি মামলার রায় এখনো বহাল রয়েছে। বিভিন্ন মামলার আপিলও বিচারাধীন।
সম্প্রতি ইমরানের দুই বোন উজমা ও নূরিন কয়েক মাস পর তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। তাদের কাছ থেকে বাবার পরিস্থিতির কথা জানার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে দুই ছেলের।
২৯ বছর বয়সী সুলাইমান খান বলেন, দুই খালা ফিরে এসে জানিয়েছেন, ইমরান অত্যন্ত অস্থির ছিলেন। তার অভিযোগ, একাকী বন্দিত্বের মাধ্যমে বাবাকে মানসিকভাবে চাপে রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইমরান সাধারণত শান্ত ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষ। কিন্তু বর্তমানে তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে এবং তিনি তীব্র উদ্বেগে ভুগছেন।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইমরানের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, তার ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। সুলাইমান জানান, কয়েক দিন আগে বোনেরা যখন ইমরানের সঙ্গে দেখা করেন, তখনো তার চোখে আই-প্যাচ ছিল।
তবে পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বলেছে, ইমরানকে যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়নি। সরকারের হিসাবে, কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে তার অন্তত ৩০ বার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। কারাগারের চিকিৎসকরাও নিয়মিত তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। সর্বশেষ মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদনে তাকে ‘সম্পূর্ণ স্থিতিশীল ও সুস্থ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎ এবং সপ্তাহে দুই দিন দুই ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও চিকিৎসক বোনকেও চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে শিফা হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। বরং ২০ আগস্ট তাকে অল্প সময়ের জন্য সরকারি পিআইএমএস হাসপাতালে পরীক্ষা করিয়ে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ আদালত অবমাননার আবেদন করেছে।
ইমরানের মুক্তির দাবিতে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কয়েকজন রাজনীতিক এবং ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক সমর্থন জানিয়েছেন। ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সহায়তা চেয়েছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বলছে, ইমরানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়নি। সরকারি হিসাবে, কারাগারে থাকার সময় তার সঙ্গে ১৯৮টি সাক্ষাৎ হয়েছে। এসব সাক্ষাতে ৯০০-এর বেশি ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, চিকিৎসক, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং অনুমোদিত পিটিআই কর্মী-সমর্থকেরা।
পরিবারের অভিযোগ ও সরকারের বক্তব্যের এই পাল্টাপাল্টির মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে ইমরানের প্রকৃত শারীরিক ও মানসিক অবস্থা। স্বাধীন চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা এবং মেডিকেল রিপোর্ট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তার দুই ছেলে।
কাসিমের প্রশ্ন, ‘যদি কিছু লুকানোর না থাকে, তাহলে স্বাধীন চিকিৎসক দিয়ে বাবার পরীক্ষা করাতে ভয় কীসের?’
বাবার মানসিক দৃঢ়তার ওপর আস্থা রেখে কাসিম বলেন, ‘এটাই সবচেয়ে কঠিন সময়। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, তিনি এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন।’

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















