তিব্বতের একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বুধবারের প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হওয়া একটি কৃত্রিম হ্রদের পানির স্তরও দ্রুত বাড়ছে। শুক্রবার হ্রদটির পানি উপচে পড়তে শুরু করায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে থাকা উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জিরং স্থলবন্দরের দিকে উদ্ধারকারী দলগুলোর এগিয়ে যাওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪৭৩ জন। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) হিসাবে এখনো ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১২১ জন বিদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবারের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে নেপাল ও চীনের তিব্বত—দুই পাশেই উদ্ধার তৎপরতা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
নতুন করে বিপদের শঙ্কা
নেপালি পুলিশ শুক্রবার সব উদ্ধারকর্মীকে ‘অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে’ নির্দেশ দেয়। পুলিশের ভাষ্য, তিব্বতের অংশে আবার একটি পানির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য তারা পেয়েছে। এর আগে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে তিব্বতের অংশেও উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল।
গত বুধবার পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে পার্বত্য অঞ্চলে যে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছিল, গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সেটির পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছিল। যেকোনো মুহূর্তে হ্রদের বাঁধ ভেঙে গিয়ে নতুন করে প্রাণঘাতী কাদা-পাথরের ধস কিংবা তীব্র পানির তোড় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি শুক্রবার সকালে জানিয়েছে, নতুন তৈরি হওয়া এই হ্রদটি উপচে পানি পড়তে শুরু করেছে। ফলে পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জিরং স্থলবন্দরের দিকে উদ্ধারকারী দলগুলোর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে থাকা সিসিটিভির এক প্রতিবেদক বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের এখানে থেমে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সামনের সারির দলগুলোর কাছ থেকে আমরা মাত্রই একটি জরুরি নির্দেশনা পেয়েছি। সেখানে সব উদ্ধারকারী দলকে জিরং বন্দরের দিকে আর না এগোতে বলা হয়েছে।’
তিনি জানান, সব উদ্ধারকারী দলকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এর আগে ওই এলাকায় পৌঁছানো জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলোকে এক কিলোমিটার পেছনে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
উদ্ধারকারী দলের সিংহভাগ সদস্য এখন জিরং শহরের লাওজিয়াং গ্রামের প্রবেশমুখে অবস্থান করছেন। গ্রামটি চীন-নেপাল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৩৫ মাইল বা প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে।
প্রাণঘাতী ঢলে বিপর্যস্ত সীমান্ত
গত বুধবার হিমালয়ের পার্বত্য এলাকায় হঠাৎ নেমে আসে সুনামির মতো পানি, কাদা, বরফ ও পাথরের বিশাল ঢল। মুহূর্তের মধ্যে নদী ও উপত্যকার স্বাভাবিক চেহারা পাল্টে যায়। বাড়িঘর, সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেসে যায় বা কাদার নিচে চাপা পড়ে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্যোগে বহু সেতু ও সড়ক ধ্বংস হওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোই উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। হিমালয়ে ট্রেকিংয়ে যাওয়া পর্যটক এবং তিব্বতের পবিত্র তুষারাবৃত কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু ধর্মাবলম্বীও এই দুর্যোগের কবলে পড়েছেন।
বেড়েছে মৃতের সংখ্যা
হিমবাহধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার বিকেলে নেপালের পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত করে। দুর্যোগে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭৩ জন।
এর কিছুক্ষণ আগে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৫৩৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছিল। পরে পুলিশ মৃতের সংখ্যা ৫৪৭ বলে জানায়। তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও শুক্রবার নেপালে ৫৪৭ জন এবং তিব্বতে পাঁচজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
এনডিআরআরএমএ জানিয়েছে, এখনো ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১২১ জন বিদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবারের ভয়াবহ ঢলের পর জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো শত শত মরদেহ উদ্ধার করেছে। বাড়িঘর ও স্থাপনা কাদার নিচে চাপা পড়ে থাকায় আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছেছেন চীনা উদ্ধারকারীরা
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মূল এলাকায় পৌঁছেছেন চীনের উদ্ধারকারীরা। নিখোঁজ শত শত মানুষকে খুঁজে বের করতে গিয়ে তাঁরা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, তিব্বতের সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র গিরং কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে তলিয়ে যাওয়ার দুই দিন পর শুক্রবার বিকেলে ২১ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল প্রথমবারের মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
বুধবারের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে তিব্বতে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। সেখানে এখনো ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযানও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















