দেশের শিল্পখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বস্ত্রশিল্প। সুতা উৎপাদন থেকে শুরু করে কাপড় তৈরি, ডাইং ও ফিনিশিং—পুরো শিল্পশৃঙ্খলই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিনের গ্যাস-সংকট এখন এই শিল্পের উৎপাদনব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন আংশিকভাবে চলছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের প্রায় ৬৬০টি বস্ত্রকল তীব্র গ্যাস-সংকটে পড়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
এক মাস ধরে ধুঁকছে উৎপাদন
গাজীপুরের ভবানীপুরে মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের পাঁচটি ইউনিটে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এক মাসের বেশি সময় ধরে কারখানাটির উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি স্বাভাবিক উৎপাদনও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেনের হিসাবে, এক মাসে কম উৎপাদনের কারণে তাদের প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ বাড়লেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে দেশের কিছু শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোথাও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, আবার কোথাও দিনের বেলায় চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকছে।
নরসিংদীর সাটিরপাড়ার ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস দীর্ঘ ২২ দিন বন্ধ থাকার পর উৎপাদনে ফিরেছে। কিন্তু শুরুতে শুধু রাতের সময় কারখানাটি চালানো সম্ভব হয়েছে। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় উৎপাদন চালু রাখা যাচ্ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়ার মতে, নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া গেলে দীর্ঘ সময় কারখানা চালানো সম্ভব হবে।
নারায়ণগঞ্জে সংকট আরও তীব্র
নরসিংদীর তুলনায় নারায়ণগঞ্জের কিছু শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো বেশি সংকটপূর্ণ। ফতুল্লার বিসিক শিল্পপার্কের এমএস ডাইং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ১১০ টন কাপড় ডাইং করার সক্ষমতা রয়েছে। গ্যাস না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে শুধু কারখানার সরাসরি উৎপাদন নয়, পোশাক কারখানায় প্রয়োজনীয় কাপড় সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বস্ত্রশিল্পের পাশাপাশি পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৭৫ শতাংশ উৎপাদন
গ্যাস-সংকটের তীব্রতা সব এলাকায় সমান নয়। শ্রীপুরের একটি বস্ত্রকলের মালিক জানিয়েছেন, তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ এখনো ২ পিএসআইয়ের নিচে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে একই এলাকার এশিয়া কম্পোজিট মিলসের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ ৩ পিএসআই থেকে বেড়ে ৭–৮ পিএসআই পর্যন্ত পাওয়ায় সুতার উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থাৎ একই শিল্পাঞ্চলের মধ্যেও গ্যাস সরবরাহের তারতম্যের কারণে কারখানাভেদে উৎপাদনের চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
শুধু বর্তমান উৎপাদন নয়, ঝুঁকিতে বিনিয়োগ ও ক্রয়াদেশ
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫২৭টি। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, ব্যবসা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত।
গ্যাসের চাপ কম থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি পুরো সক্ষমতায় চালানো যায় না। উৎপাদন কমে গেলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সময়মতো ক্রয়াদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চললে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পও চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিটিএমএর সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান চৈতি কম্পোজিটেও গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশে নেমেছে। তাঁর মতে, প্রায় এক মাস ধরে অধিকাংশ বস্ত্রকল একই ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস-সংকটে বস্ত্রকলগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিদেশি ক্রেতারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন তিনি।
সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহে ধাক্কা
শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংকট তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় বিঘ্নকে দেখা হচ্ছে।
গত ২১ জুলাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে ব্যবহৃত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। পরে ১৫ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক এবং সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলেও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এরপর কার্গো-সংক্রান্ত সমস্যায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তিন দিন বন্ধ থাকার পর ২২ আগস্ট সেটি পুনরায় চালু হলে দেশের কিছু এলাকায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
২৪৪ কারখানা আগে থেকেই বন্ধ
গ্যাস-সংকটের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য যোগ হয়েছে। বিটিএমএর হিসাবে, ২০১৯ সাল থেকে ২৪৪টি বস্ত্রকল বন্ধ রয়েছে।
অর্থাৎ নতুন করে ৬৬০টি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা এমন একটি শিল্পখাতে ঘটছে, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই নানা কারণে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট শিল্পটির পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ চায় মালিকেরা
বিটিএমএ জানিয়েছে, গ্যাস-সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত বস্ত্রকলগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা ও যাচাই করা হচ্ছে। মূল্যায়ন শেষ হলে বন্ধ বা দুর্বল হয়ে পড়া কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে কী ধরনের সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শিল্পমালিকদের প্রধান প্রত্যাশা এখন একটি নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা। কারণ কয়েক ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া এবং কয়েক ঘণ্টা না পাওয়া—এভাবে অনিয়মিত সরবরাহে আধুনিক শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন।
গ্যাসের চাপ সাময়িকভাবে কিছুটা বাড়লেও বস্ত্রশিল্পের জন্য স্থায়ী সমাধান এখনো জরুরি। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বন্ধ ও কম উৎপাদনে থাকা কারখানাগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারে। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রক্ষা, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়াদেশ পূরণে বিলম্ব, আর্থিক ক্ষতি এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
তাই বস্ত্রশিল্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ বাড়ানো নয়—দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। দেশের রপ্তানি ও শিল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, তার বড় অংশই নির্ভর করছে এই সংকট কত দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সমাধান করা যায় তার ওপর।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















