যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের বাজারে বাংলাদেশের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকায় সিমেন্ট, আলু, ওষুধসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়লেও সরাসরি অর্থ পরিশোধে জটিলতায় পড়ছেন মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা। এই পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা দুবাইয়ের মতো তৃতীয় দেশ থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য পরিশোধের সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে।
দেশটির ব্যবসায়ীদের সরাসরি ডলার পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ফলে মিয়ানমারের যেসব ব্যবসায়ী বিদেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তাঁদের মাধ্যমে তৃতীয় দেশ থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য দেশে আনার পথ খুলছে।
সরাসরি লেনদেনে বাধা, বিকল্প পথে সমাধান
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ‘এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুড’ মিয়ানমারে পণ্য রপ্তানির অর্থ তৃতীয় কোনো দেশ থেকে গ্রহণের অনুমতি চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, আলু ও ওষুধ কিনতে আগ্রহী। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডলার সংকটের কারণে তাঁরা মিয়ানমার থেকে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন না।
তাই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা দুবাইয়ে থাকা তাঁদের ব্যবসায়িক হিসাব থেকে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মূল্য পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে আবেদনের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বিধানেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
সীমান্তের কাছে বাড়ছে পণ্যের চাহিদা
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত দেশটির পরিবহন ও অবকাঠামো ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন এলাকায় সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সড়ক যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে নানা বাধা।
এ কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় তুলনামূলক সহজে পাওয়া যায় এমন বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে সিমেন্টের বাজারে সম্ভাবনা দেখছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।
মিয়ানমারে সিমেন্ট উৎপাদনকারী কারখানার সংখ্যা কম হওয়ায় দেশটিতে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি আলু, ওষুধ এবং বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকসের বাজারও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
তবে নিরাপত্তা ও অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা এখনো বড় বাধা। বিশেষ করে সিমেন্টের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা রয়েছে। কারণ, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এই পণ্য সামরিক স্থাপনা বা বাংকার তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
রপ্তানি আয়েও ইতিবাচক পরিবর্তন
মিয়ানমারের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মিয়ানমারে প্রায় ৩ কোটি ৮৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪১ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে সিমেন্ট ও আলুর পাশাপাশি সুতা এবং পাটজাত পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে। নতুন করে ওষুধ, এনার্জি ড্রিংকসসহ আরও কিছু পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
বিদেশে থাকা মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরাই হতে পারেন সেতু
মিয়ানমারের অনেক বড় ব্যবসায়ী বর্তমানে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। ফলে তাঁদের বিদেশি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। এতে মিয়ানমারের দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত পথে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনা সম্ভব হবে।
এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটি বড় সমস্যা কমতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় দেশে আনার প্রক্রিয়াও সহজ হবে।
রোহিঙ্গা সংকটে কমেছিল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একসময় সীমান্তবাণিজ্যের সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র সংঘাতের কারণে দুই দেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এস এম নুরুল হকের মতে, রোহিঙ্গা আগমনের পর দুই দেশের বাণিজ্য আগের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বাণিজ্য আবারও গতি পেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অগ্রগতি হলে দুই দেশের সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চীন–মিয়ানমার–চট্টগ্রাম করিডর নতুন সম্ভাবনার দরজা
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে প্রস্তাবিত চীন–মিয়ানমার–চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডর ঘিরে।
এই করিডর বাস্তবায়িত হলে চীন, মিয়ানমার, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য আরও সহজ হতে পারে। ব্যবসায়ীদের আশা, এর মাধ্যমে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গেও বাংলাদেশের সরাসরি পণ্য বিনিময়ের সুযোগ বাড়বে।
বর্তমানে কোনো কোনো বাণিজ্যিক পরিবহনে যেখানে প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে, করিডরটি কার্যকর হলে তা এক দিনে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।
এতে শুধু পণ্য পরিবহনের সময়ই কমবে না, পরিবহন ব্যয়ও কমতে পারে। সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন বাজারের সুবিধা পেতে পারে।
টেকনাফ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যদ্বার
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের স্থলবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ টেকনাফ স্থলবন্দর। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তাই রপ্তানি বাড়াতে হলে নিরাপত্তা, পণ্য পরিবহন, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সামনে বড় বাজার, তবে সতর্কতাও জরুরি
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি ঝুঁকিও তৈরি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পণ্য পাঠানো, অর্থ পরিশোধ এবং পণ্য পরিবহন—প্রতিটি ধাপেই বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বিশেষ করে তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, ব্যাংকিং চ্যানেল, আমদানিকারকের পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এসব বিষয় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মিয়ানমারের বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে মিয়ানমারের বাজারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলছে। সিমেন্ট, আলু, ওষুধ, পাটপণ্য, সুতা ও খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি সীমান্তবাণিজ্যও নতুন গতি পেতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















