০৩:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভূমিকম্প নয়, ভূমিধস: নেপালে মৃত্যু বেড়ে ১৬৫, নিখোঁজ সহস্রাধিক

The gallery was not found!

নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও পার্লামেন্টে বলেছিলেন, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন রেকর্ড হওয়ার তিন মিনিট পরই নেমে আসে ভয়াবহ বন্যা। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, সেটি ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের বিপুল বরফ ও পাথর প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়ার অভিঘাতকেই ভূকম্পন হিসেবে শনাক্ত করেছিল যন্ত্র।

অর্থাৎ, মাটি কেঁপে হিমবাহ ভাঙেনি; হিমবাহ ভেঙেই কেঁপেছিল মাটি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া দুর্যোগটির এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এটিই। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের বড় অংশ ভেঙে বরফ, পাথর ও পলির বিশাল ধস তৈরি করে। সেই ধস আছড়ে পড়ে উপত্যকায়। এরপর লেন্দে নদী দিয়ে প্রবল বেগে নেমে আসে পানি ও ধ্বংসাবশেষের দেয়াল।

ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ধরে তা ছড়িয়ে পড়ে নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোটসহ ভাটির জনপদে। মাত্র ৩০ মিনিটে গালছি এলাকায় নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যায়। এত অল্প সময়ে আসা ঢল থেকে পালানোর সুযোগও পাননি অনেকে।

ধ্বংসের হিসাব এখনো অসম্পূর্ণ

নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। নেপালে নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন অন্তত ৮২৬ জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

তবে দুই দেশের নিখোঁজের তালিকায় একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার রয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে সংখ্যা দুটি সরাসরি যোগ করে মোট নিখোঁজের নিশ্চিত হিসাব দেওয়া ঠিক হবে না। দুর্যোগের প্রথম পাঠ এখানেই: দ্রুত বদলাতে থাকা সংখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য বানালে সংবাদ হয় না, শুধু বড় অঙ্ক হয়।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় অংশ পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। তারা কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার জনপ্রিয় পথটিতে অবস্থান করছিলেন। নেপালের তালিকায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তিব্বত অংশেও অন্তত ২৬০ বিদেশি নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনা সংবাদমাধ্যম।

বন্যা ঘরবাড়ি ও বাজারের পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা ভাসিয়ে নিয়েছে। নেপালের কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ি সড়ক নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না। হেলিকপ্টারে উদ্ধারকাজ চললেও খারাপ আবহাওয়া ও নদীর অস্বাভাবিক গতিপথ সেই অভিযানও কঠিন করে তুলেছে।

কয়েক সেকেন্ডে বদলে যাওয়া জীবন

রসুয়ার ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বরাল জানান, কাদা ও পানির বিশাল ঢেউ ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। স্ত্রীর হাত ধরেও রাখতে পারেননি; স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারে কেশবকে উদ্ধার করা হলেও তার স্ত্রীর সন্ধান মেলেনি।

আরেক শ্রমিক বিবেক কুমাল স্রোতের মধ্যে ভেসে যাওয়ার সময় একটি আমগাছ ধরে বেঁচে যান। তার চোখের সামনে যে বাড়িতে তিনি কাজ করছিলেন, সেটি মাটি, পাথর ও পানির নিচে হারিয়ে যায়।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের স্থির ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতেও দেখা গেছে, পানি ও ধ্বংসাবশেষের দেয়াল ধেয়ে আসার সময় মানুষ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভবন, গাড়ি ও মানুষকে গ্রাস করে নেয় সেই স্রোত।

আসলে কী ঘটেছিল

প্ল্যানেট ল্যাবসের দুর্যোগের আগের ও পরের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সবুজ পাহাড় ও হিমবাহঘেরা উপত্যকার বড় অংশ এখন বাদামি পলি ও ধ্বংসস্তূপে ঢাকা। ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ববিদ বিক্রম গুপ্তের মতে, হিমবাহের অগ্রভাগের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়াই ঘটনার সূচনা করেছে। ধস নামার সময় এর সঙ্গে বিপুল পাথর ও মাটি যুক্ত হয়ে আরও শক্তিশালী ধ্বংসপ্রবাহ তৈরি হয়।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার উপগ্রহচিত্রে দেখেছেন, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকার অনেক তুষার গলে হিমবাহের খোলা বরফ বেরিয়ে পড়েছিল। এতে সেখানে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া থাকার ইঙ্গিত মেলে। তবে স্থানীয় আবহাওয়াকেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া উষ্ণতাই ধসের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল—এ কথা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এটি প্রচলিত অর্থে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যা বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। পাওয়া তথ্য বরং একটি বড় ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধসের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করছে। ধসটি নদীতে পড়ার পর পানি, বরফ, পাথর ও পলির সম্মিলিত প্রবাহ ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কতটা

একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলতে হলে আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সেই গবেষণা এখনো হয়নি। তবে ঘটনাটি যে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা হিমালয়ে ঘটেছে, সেই প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের পর্বতাঞ্চল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। আগের দশকের তুলনায় গত দশকে দেশটির হিমবাহ গলার গতি ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বরফ দ্রুত গললে হিমবাহ দুর্বল হয়, পাহাড়ের জমাট কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং বরফ-পাথরের ধস বা হিমবাহ হ্রদ ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে পাহাড়ি অঞ্চলে সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণও ঝুঁকিকে কতটা বাড়িয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন সব দায়ের সুবিধাজনক ডাস্টবিন নয়; দুর্বল পরিকল্পনা ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণের হিসাবও নিতে হবে।

শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়

এই বিপর্যয় নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী নদী ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। উজানের তিব্বত অংশে কী ঘটছে, সেই তথ্য দ্রুত ভাটির নেপালে পৌঁছানোর কার্যকর ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

এর আগে একই নদীব্যবস্থায় বড় বন্যার পর দুই দেশ তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিক চুক্তি ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। এবারের বিপর্যয়ের সময় সীমান্তের যোগাযোগ, সড়ক ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের কর্তৃপক্ষই দীর্ঘ সময় দুর্যোগের উৎস ও মাত্রা সম্পর্কে অন্ধকারে ছিল।

হিমবাহের ধস ঠেকানো সব সময় সম্ভব নয়। কিন্তু উপগ্রহ নজরদারি, নদীতে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, সীমান্তপারের তথ্য বিনিময় এবং ভাটির জনপদে দ্রুত সতর্কবার্তা অন্তত মানুষকে পালানোর কিছু সময় দিতে পারে। আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়ে গেলে সেই কয়েক মিনিটই জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান।

উদ্ধারকাজে নেপাল ও চীন সেনা ও জরুরি কর্মী মোতায়েন করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সহায়তা পাঠাচ্ছে। কিন্তু এখনো বহু এলাকা বিচ্ছিন্ন, বহু পরিবার স্বজনের খোঁজে অপেক্ষায় এবং নদীর উজানে নতুন প্রতিবন্ধকতা থেকে দ্বিতীয় দফা ঢল নামার ঝুঁকিও পুরোপুরি কাটেনি।

এই দুর্যোগের তাৎক্ষণিক সূত্র এখন অনেকটাই দৃশ্যমান: ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে ভেঙে পড়া হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধস। কিন্তু বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে এমন বিপর্যয় যদি নতুন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে ভাটির কোটি মানুষের জন্য প্রস্তুতি কোথায়?

কারণ পাহাড়ের বরফ ভাঙার শব্দ সীমান্তে থেমে থাকে না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

Business Times24

ভূমিকম্প নয়, ভূমিধস: নেপালে মৃত্যু বেড়ে ১৬৫, নিখোঁজ সহস্রাধিক

Update Time : ১২:১২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও পার্লামেন্টে বলেছিলেন, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন রেকর্ড হওয়ার তিন মিনিট পরই নেমে আসে ভয়াবহ বন্যা। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, সেটি ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের বিপুল বরফ ও পাথর প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়ার অভিঘাতকেই ভূকম্পন হিসেবে শনাক্ত করেছিল যন্ত্র।

অর্থাৎ, মাটি কেঁপে হিমবাহ ভাঙেনি; হিমবাহ ভেঙেই কেঁপেছিল মাটি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া দুর্যোগটির এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এটিই। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের বড় অংশ ভেঙে বরফ, পাথর ও পলির বিশাল ধস তৈরি করে। সেই ধস আছড়ে পড়ে উপত্যকায়। এরপর লেন্দে নদী দিয়ে প্রবল বেগে নেমে আসে পানি ও ধ্বংসাবশেষের দেয়াল।

ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ধরে তা ছড়িয়ে পড়ে নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোটসহ ভাটির জনপদে। মাত্র ৩০ মিনিটে গালছি এলাকায় নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যায়। এত অল্প সময়ে আসা ঢল থেকে পালানোর সুযোগও পাননি অনেকে।

ধ্বংসের হিসাব এখনো অসম্পূর্ণ

নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। নেপালে নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন অন্তত ৮২৬ জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

তবে দুই দেশের নিখোঁজের তালিকায় একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার রয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে সংখ্যা দুটি সরাসরি যোগ করে মোট নিখোঁজের নিশ্চিত হিসাব দেওয়া ঠিক হবে না। দুর্যোগের প্রথম পাঠ এখানেই: দ্রুত বদলাতে থাকা সংখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য বানালে সংবাদ হয় না, শুধু বড় অঙ্ক হয়।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় অংশ পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। তারা কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার জনপ্রিয় পথটিতে অবস্থান করছিলেন। নেপালের তালিকায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তিব্বত অংশেও অন্তত ২৬০ বিদেশি নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনা সংবাদমাধ্যম।

বন্যা ঘরবাড়ি ও বাজারের পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা ভাসিয়ে নিয়েছে। নেপালের কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ি সড়ক নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না। হেলিকপ্টারে উদ্ধারকাজ চললেও খারাপ আবহাওয়া ও নদীর অস্বাভাবিক গতিপথ সেই অভিযানও কঠিন করে তুলেছে।

কয়েক সেকেন্ডে বদলে যাওয়া জীবন

রসুয়ার ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বরাল জানান, কাদা ও পানির বিশাল ঢেউ ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। স্ত্রীর হাত ধরেও রাখতে পারেননি; স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারে কেশবকে উদ্ধার করা হলেও তার স্ত্রীর সন্ধান মেলেনি।

আরেক শ্রমিক বিবেক কুমাল স্রোতের মধ্যে ভেসে যাওয়ার সময় একটি আমগাছ ধরে বেঁচে যান। তার চোখের সামনে যে বাড়িতে তিনি কাজ করছিলেন, সেটি মাটি, পাথর ও পানির নিচে হারিয়ে যায়।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের স্থির ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতেও দেখা গেছে, পানি ও ধ্বংসাবশেষের দেয়াল ধেয়ে আসার সময় মানুষ দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভবন, গাড়ি ও মানুষকে গ্রাস করে নেয় সেই স্রোত।

আসলে কী ঘটেছিল

প্ল্যানেট ল্যাবসের দুর্যোগের আগের ও পরের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সবুজ পাহাড় ও হিমবাহঘেরা উপত্যকার বড় অংশ এখন বাদামি পলি ও ধ্বংসস্তূপে ঢাকা। ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ববিদ বিক্রম গুপ্তের মতে, হিমবাহের অগ্রভাগের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়াই ঘটনার সূচনা করেছে। ধস নামার সময় এর সঙ্গে বিপুল পাথর ও মাটি যুক্ত হয়ে আরও শক্তিশালী ধ্বংসপ্রবাহ তৈরি হয়।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার উপগ্রহচিত্রে দেখেছেন, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকার অনেক তুষার গলে হিমবাহের খোলা বরফ বেরিয়ে পড়েছিল। এতে সেখানে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া থাকার ইঙ্গিত মেলে। তবে স্থানীয় আবহাওয়াকেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া উষ্ণতাই ধসের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল—এ কথা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এটি প্রচলিত অর্থে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যা বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। পাওয়া তথ্য বরং একটি বড় ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধসের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করছে। ধসটি নদীতে পড়ার পর পানি, বরফ, পাথর ও পলির সম্মিলিত প্রবাহ ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কতটা

একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলতে হলে আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সেই গবেষণা এখনো হয়নি। তবে ঘটনাটি যে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা হিমালয়ে ঘটেছে, সেই প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের পর্বতাঞ্চল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। আগের দশকের তুলনায় গত দশকে দেশটির হিমবাহ গলার গতি ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বরফ দ্রুত গললে হিমবাহ দুর্বল হয়, পাহাড়ের জমাট কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং বরফ-পাথরের ধস বা হিমবাহ হ্রদ ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে পাহাড়ি অঞ্চলে সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণও ঝুঁকিকে কতটা বাড়িয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন সব দায়ের সুবিধাজনক ডাস্টবিন নয়; দুর্বল পরিকল্পনা ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণের হিসাবও নিতে হবে।

শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়

এই বিপর্যয় নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী নদী ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। উজানের তিব্বত অংশে কী ঘটছে, সেই তথ্য দ্রুত ভাটির নেপালে পৌঁছানোর কার্যকর ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

এর আগে একই নদীব্যবস্থায় বড় বন্যার পর দুই দেশ তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিক চুক্তি ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। এবারের বিপর্যয়ের সময় সীমান্তের যোগাযোগ, সড়ক ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের কর্তৃপক্ষই দীর্ঘ সময় দুর্যোগের উৎস ও মাত্রা সম্পর্কে অন্ধকারে ছিল।

হিমবাহের ধস ঠেকানো সব সময় সম্ভব নয়। কিন্তু উপগ্রহ নজরদারি, নদীতে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, সীমান্তপারের তথ্য বিনিময় এবং ভাটির জনপদে দ্রুত সতর্কবার্তা অন্তত মানুষকে পালানোর কিছু সময় দিতে পারে। আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়ে গেলে সেই কয়েক মিনিটই জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান।

উদ্ধারকাজে নেপাল ও চীন সেনা ও জরুরি কর্মী মোতায়েন করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সহায়তা পাঠাচ্ছে। কিন্তু এখনো বহু এলাকা বিচ্ছিন্ন, বহু পরিবার স্বজনের খোঁজে অপেক্ষায় এবং নদীর উজানে নতুন প্রতিবন্ধকতা থেকে দ্বিতীয় দফা ঢল নামার ঝুঁকিও পুরোপুরি কাটেনি।

এই দুর্যোগের তাৎক্ষণিক সূত্র এখন অনেকটাই দৃশ্যমান: ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে ভেঙে পড়া হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধস। কিন্তু বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে এমন বিপর্যয় যদি নতুন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে ভাটির কোটি মানুষের জন্য প্রস্তুতি কোথায়?

কারণ পাহাড়ের বরফ ভাঙার শব্দ সীমান্তে থেমে থাকে না।