০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নোনা পানি শোধন করে পাইপলাইনে সরবরাহের পরিকল্পনা সরকারের

The gallery was not found!

দেশের নিরাপদ পানি সরবরাহে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। লবণাক্ত পানি শোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

প্রতিমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শহরের মোট পানির চাহিদার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করা উচিত। কিন্তু ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৭৪ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। বিপরীতে উপরিভাগের পানি ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ২৪ শতাংশ। তার মতে, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি ভূমিকম্পের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো লবণাক্ত পানি শোধন করে ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান শাহে আলম। সমুদ্র ও নদীর মিলনস্থলকে কেন্দ্র করে চাঁদপুর ও মোংলায় দুটি বড় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শোধন করা পানি গ্যাস বা বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের মতো পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই পানি সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে জাতীয় পর্যায়ের একটি বড় অবকাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।

ঢাকার পানি সংকট মোকাবিলায় একাধিক প্রকল্প

ঢাকার পানি চাহিদার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানি মিলিয়ে ঢাকা ওয়াসা প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ থেকে ৩ কোটি ৫ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করছে। ফলে প্রতিদিনই কিছুটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণ এবং ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে মেঘনা নদী থেকে প্রতিদিন ঢাকায় প্রায় ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া সায়েদাবাদ প্রকল্প নিয়েও ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে মেঘনা নদী থেকে শোধন করে ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে প্রতিদিন ৯৫ কোটি লিটার পানি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০৩০ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ডেনমার্কের অর্থসহায়তা

প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ের কাজে ডেনমার্ক সরকার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা করবে বলে জানান শাহে আলম। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা অনুদান এবং প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। ঋণের সুদের হার হবে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ এবং কাজ শেষ হওয়ার পরবর্তী ২০ বছরে তা পরিশোধ করতে হবে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পানি শোধন, পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন কাজে ডেনমার্ক প্রায় ১০০ কোটি টাকা সহায়তা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

সৌরবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি

ডেনমার্কের সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করতে দেশটি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের জন্য ডেনমার্ককে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করে সহযোগিতার ধরন নির্ধারণ করবে ডেনমার্ক।

সব মিলিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো, ঢাকার পানি সংকট মোকাবিলা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পানি শোধন ও পাইপলাইনভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে চাঁদপুর ও মোংলার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে বাস্তবায়নযোগ্যতা, ব্যয় ও সময়সীমা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যাবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

নিত্যপণ্যের দামে বাজারের বাজেট এলোমেলো

Business Times24

নোনা পানি শোধন করে পাইপলাইনে সরবরাহের পরিকল্পনা সরকারের

Update Time : ০৯:০১:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

দেশের নিরাপদ পানি সরবরাহে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। লবণাক্ত পানি শোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

প্রতিমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শহরের মোট পানির চাহিদার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করা উচিত। কিন্তু ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৭৪ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। বিপরীতে উপরিভাগের পানি ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ২৪ শতাংশ। তার মতে, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি ভূমিকম্পের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো লবণাক্ত পানি শোধন করে ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান শাহে আলম। সমুদ্র ও নদীর মিলনস্থলকে কেন্দ্র করে চাঁদপুর ও মোংলায় দুটি বড় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শোধন করা পানি গ্যাস বা বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের মতো পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই পানি সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে জাতীয় পর্যায়ের একটি বড় অবকাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।

ঢাকার পানি সংকট মোকাবিলায় একাধিক প্রকল্প

ঢাকার পানি চাহিদার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানি মিলিয়ে ঢাকা ওয়াসা প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ থেকে ৩ কোটি ৫ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করছে। ফলে প্রতিদিনই কিছুটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণ এবং ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে মেঘনা নদী থেকে প্রতিদিন ঢাকায় প্রায় ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া সায়েদাবাদ প্রকল্প নিয়েও ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে মেঘনা নদী থেকে শোধন করে ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে প্রতিদিন ৯৫ কোটি লিটার পানি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০৩০ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ডেনমার্কের অর্থসহায়তা

প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ের কাজে ডেনমার্ক সরকার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা করবে বলে জানান শাহে আলম। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা অনুদান এবং প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। ঋণের সুদের হার হবে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ এবং কাজ শেষ হওয়ার পরবর্তী ২০ বছরে তা পরিশোধ করতে হবে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পানি শোধন, পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন কাজে ডেনমার্ক প্রায় ১০০ কোটি টাকা সহায়তা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

সৌরবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি

ডেনমার্কের সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করতে দেশটি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের জন্য ডেনমার্ককে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করে সহযোগিতার ধরন নির্ধারণ করবে ডেনমার্ক।

সব মিলিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো, ঢাকার পানি সংকট মোকাবিলা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পানি শোধন ও পাইপলাইনভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে চাঁদপুর ও মোংলার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে বাস্তবায়নযোগ্যতা, ব্যয় ও সময়সীমা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যাবে।