রেলপথ সম্প্রসারণ, নতুন সেতু ও স্টেশন নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু যে ইঞ্জিনে ট্রেন চলবে, সেগুলোর বড় অংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। প্রয়োজনের তুলনায় মেরামতের সক্ষমতাও কম। ফলে নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে সক্রিয় বহরে লোকোমোটিভ ছিল ৩১৭টি। এর মধ্যে ১৯২টি বা প্রায় ৬১ শতাংশের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভগুলোর ১০৩টি আবার ৪০ বছরের বেশি পুরোনো। রেলওয়ের হিসাবে একটি লোকোমোটিভের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর। অর্থাৎ বহরের একটি বড় অংশ নির্ধারিত আয়ুষ্কালের দ্বিগুণ সময় ধরে চালানো হচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
পুরোনো ইঞ্জিন চালু রাখতে বাড়ছে মেরামতের চাপ। কিন্তু পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা এবং পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানার যন্ত্রপাতি, জনবল ও উৎপাদনক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কোথাও প্রশিক্ষিত কর্মীর সংকট, কোথাও অর্ধশতাব্দীর পুরোনো যন্ত্রপাতি—সব মিলিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের চক্রটি নিজেই এখন মেরামতের অপেক্ষায়।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে। ইঞ্জিন বিকল হওয়া, ট্রেন দেরিতে ছাড়া, মাঝপথে থেমে যাওয়া এবং লোকোমোটিভের অভাবে ট্রেন বাতিল—এসব আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নতুন রেললাইন থাকলেও চালানোর মতো নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন না থাকলে সেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায় না।
সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় কনটেইনার পরিবহন। লোকোমোটিভ-সংকটে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এই পথে মালবাহী ট্রেন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মাসে প্রায় ১২০টি কনটেইনার ট্রেন চলার জায়গায় কোনো কোনো সময়ে তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। এতে বন্দরে কনটেইনার জমেছে, আমদানিকারকদের খরচ বেড়েছে এবং রেলের লাভজনক পণ্য পরিবহন সড়কের হাতে চলে যাচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার
ট্রাকশন মোটরেই বড় বাধা
ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ট্রাকশন মোটর। এটি ইঞ্জিনের উৎপাদিত বৈদ্যুতিক শক্তিকে চাকায় ঘূর্ণনশক্তিতে রূপান্তর করে। মোটর বিকল হলে সচল ইঞ্জিনও কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে।
রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থায় ট্রাকশন মোটর খোলা, ত্রুটি শনাক্ত করা এবং সীমিত কিছু কাজ করা গেলেও পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণ ও পরীক্ষা করার আধুনিক সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। প্রয়োজনীয় কয়েল, বিশেষায়িত যন্ত্র, পরীক্ষাগার এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি ‘শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার একটি জায়গা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাকশন মোটর ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কারখানার একটি কক্ষ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীনের ভাষ্য ভিন্ন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে এখনো জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়নি। শ্রীজা মেটাল বাইরে মোটর মেরামত করে পরীক্ষার জন্য পার্বতীপুরে নিয়ে আসে। পরীক্ষার আগে কয়েক দিন যন্ত্রাংশ রাখার প্রয়োজন হওয়ায় নির্দিষ্ট চার্জের বিনিময়ে জায়গা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে রেলওয়ে। এ জন্য গঠিত কমিটি এখনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
ফলে এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি। একটি হচ্ছে রেলের নিজস্ব মেরামত-সক্ষমতার ঘাটতি—যার পক্ষে দৃশ্যমান প্রমাণ রয়েছে। অন্যটি হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া বা কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ—যার পক্ষে প্রকাশিত কপিতে কোনো চুক্তি, দরপত্র, আর্থিক নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। প্রমাণ ছাড়া দ্বিতীয়টিকে প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতি বলা যাবে না।
পুরোনো ইঞ্জিন মেরামত কতটা লাভজনক
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের মতে, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া লোকোমোটিভ বারবার মেরামত করে চালানোর আগে এর ব্যয় ও সম্ভাব্য সেবাকাল হিসাব করা প্রয়োজন। একটি ট্রাকশন মোটর মেরামত করলেই পুরো লোকোমোটিভ নতুন হয়ে যায় না। ইঞ্জিনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশও পুরোনো থাকলে কিছুদিন পর আবার বড় ত্রুটি দেখা দিতে পারে।
এই অবস্থায় তৃতীয় পক্ষ দিয়ে মেরামতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি লোকোমোটিভের জন্য ‘লাইফ সাইকেল কস্ট’ নির্ধারণ করা দরকার। মেরামতের মোট ব্যয়, সম্ভাব্য আয়ু, জ্বালানি ব্যবহার, যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা এবং বিকল থাকার সময় হিসাব করে দেখতে হবে—মেরামত লাভজনক, নাকি নতুন লোকোমোটিভ কেনাই সাশ্রয়ী।
তবে পুরোনো ইঞ্জিন মানেই সঙ্গে সঙ্গে বাতিল—বিষয়টি এত সরলও নয়। যথাযথ ওভারহলিং ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক লোকোমোটিভ আয়ুষ্কালের পরও নিরাপদে চালানো যায়। আসল প্রশ্ন হলো, সিদ্ধান্তটি প্রকৌশল ও আর্থিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি শুধু সাময়িকভাবে সংকট সামাল দিতে জোড়াতালি দেওয়া হচ্ছে।
সংকট শুধু যান্ত্রিক বিভাগের নয়
রেলওয়ের সমস্যার পুরো দায় যান্ত্রিক বিভাগের ওপর চাপালে সংকটের বড় অংশ আড়ালে থেকে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন রেলপথ, সেতু ও দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্প অগ্রাধিকার পেয়েছে। তুলনায় লোকোমোটিভ, কোচ, খুচরা যন্ত্রাংশ, দক্ষ কর্মী এবং কারখানার আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ ছিল কম ও বিলম্বিত।
২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে পুরোনো কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ধারাবাহিকভাবে এগোয়নি। দ্য ডেইলি স্টার
লোকোমোটিভ কেনা থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ সংগ্রহেও দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। সময়মতো খুচরা যন্ত্রাংশ না এলে নতুন ইঞ্জিনও দীর্ঘ সময় কারখানায় পড়ে থাকতে পারে। তবে তিন-চার বছর আগে কেনা ইঞ্জিনের “অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে”—এমন দাবি প্রযুক্তিগতভাবে অসংগত। নতুন ইঞ্জিন বিকল হতে পারে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল তিন-চার বছরে শেষ হয় না। সে ক্ষেত্রে নকশাগত ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, পরিচালনা বা ওয়ারেন্টি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়েছে কি না—সেটিই তদন্তের বিষয়।
চীন থেকে কেনা ডেমু ট্রেন দীর্ঘদিন অকেজো পড়ে থাকার ঘটনাও একই দুর্বলতার উদাহরণ। তবে ডেমু ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় শুধু মেরামতকারী বিভাগকে দেওয়া যাবে না। যান কেনার আগে উপযোগিতা যাচাই, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ক্রয়কারী ও নীতিনির্ধারকদেরও ছিল।
আধুনিকায়নের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নই পরীক্ষা
রেলওয়ে সৈয়দপুর, পাহাড়তলী ও পার্বতীপুরের তিনটি কারখানা আধুনিকায়ন এবং দেশে কোচ সংযোজন পুনরায় শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ পরিকল্পনার ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এডিবির একটি দল সৈয়দপুর কারখানা পরিদর্শনও করে। পরে শুধু সৈয়দপুর কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য প্রকল্পের কথাও জানানো হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাসস
কিন্তু নতুন যন্ত্র কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অতীতে আধুনিকায়নের পরও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে সৈয়দপুর কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
এ কারণে আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় যন্ত্রপাতির পাশাপাশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, যন্ত্রের নিয়মিত ব্যবহার এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে পুরোনো অকেজো যন্ত্রের পাশে নতুন অকেজো যন্ত্র বসবে—সরকারি প্রকল্পে দৃশ্যটি খুব নতুন নয়।
রেলওয়ের বর্তমান সংকট মূলত তিন স্তরের ব্যর্থতার ফল: মেয়াদোত্তীর্ণ বহর, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা এবং অবকাঠামোকেন্দ্রিক নীতিগত অগ্রাধিকার। কোন ইঞ্জিন মেরামত হবে, কোনটি বাতিল হবে এবং কোথায় নতুন লোকোমোটিভ প্রয়োজন—এসব নিয়ে প্রকাশ্য ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা না করলে লোকসান বাড়তেই থাকবে।
রেলপথ বানানো উন্নয়ন। কিন্তু সেই পথে চালানোর মতো ইঞ্জিন না রাখা পরিকল্পনা নয়—অর্ধেক কাজ শেষ করে ফিতা কাটার আয়োজন।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















