তেহরানের জন্য সময়টা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ওয়াশিংটন থেকে স্কট বেসেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়ার আগেই মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করেছে। এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাল্লা স্পষ্টতই ভারী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের রণকৌশল অত্যন্ত সোজাসাপ্টা প্রতিপক্ষ যখন কোণঠাসা হয়ে পিছু হটছে, তখন বাড়তি কিছু না করে কেবল নিজেদের অবস্থানে অটল থেকে চাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখন আবার তেল পরিবহণ শুরু হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার তেহরানের যে চাল ছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো যাদের ওপর তেহরান এতদিন হামলা চালিয়ে আসছিল তারাও এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহ থেকে আর্থিক লেনদেনসহ সব ধরনের লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
কয়েক দশক ধরে তেহরানের জন্য নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার প্রধান কেন্দ্র ছিল দুবাই; একই সঙ্গে ইরানের মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসত এই শহরের মাধ্যমেই।
এমনিতেই ব্যাপক বেকারত্ব আর নানা সংকটের মধ্যে ইরানে মূল্যস্ফীতি ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর ফলে দেশটির সাধারণ সেনাবাহিনীকে নিয়মিত বেতন দিতেও সরকার হিমশিম খাচ্ছিল।
এখন এমনকি রেভল্যুশনারি গার্ডের ওপরও এর মারাত্মক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ার কথা—যা এই শাসকগোষ্ঠীর আসল ভিত্তিকেই ঝুঁকিতে ফেলে দেবে।
শুক্রবার যে খবরটি এসেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে। সপ্তাহে প্রায় ২০০টি জাহাজ (যা আরও বাড়ছে) এখন নিরাপদে যাতায়াত করছে, যা মাত্র দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ৪০০ শতাংশ বেশি।
অবশ্য এই হার এখনো যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে কম। তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের উৎপাদন ও রপ্তানি পথের পরিবর্তনের বদৌলতে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এটি যথেষ্ট—যদিও জানুয়ারির স্তরের তুলনায় দাম কিছুটা বেশিই রয়েছে।
ইরানের নেতারা এখন আবার সেই পুরোনো ‘ভালো পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ খেলা শুরু করেছেন। তাদের একদল প্রতিনিধি মুখে হুমকি-ধমকি দিয়ে ফেনা তুলছেন, আর আরেক দল দাবি করছেন যে, তারা শান্তি চান এবং আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তবে ওয়াশিংটন যদি এই ‘প্রস্তাবে’ সাড়া দেয়, তাহলে কোনো অর্থপূর্ণ আলোচনায় বসার ভান করার আগেই তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একের পর এক ছাড় আদায়ের দাবি তুলতে শুরু করবে।
এই চালটি মূলত ট্রাম্পের দেশীয় সমালোচকদের তৈরি করা বয়ানকে সমর্থন দেওয়ার জন্যই চালাচ্ছ তেহরান। তাদের সেই বয়ানটি হলো—ইরানের নেতৃত্ব একটি স্থায়ী শান্তির জন্য উদগ্রীব ছিল, কিন্তু মার্কিন-ইসরাইল হামলার কারণে তথাকথিত মধ্যপন্থিরা মারা পড়েছেন এবং ‘কঠোরপন্থিরা ক্ষমতা দখল করেছে’। তাই এই কঠোরপন্থিদের হারাতে হলে বাকি ‘মধ্যপন্থিদের’ সঙ্গেই চুক্তি করতে হবে, যাতে তারা ‘চরমপন্ন্থিদের’ হটিয়ে দিতে পারে।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে এই এক কৌশল বারবার রূপ বদলে খেলে আসছে। কিন্তু পশ্চিমা উদারপন্থিরা (বিশেষ করে গণমাধ্যমগুলো) প্রতিবারই এই ফাঁদে পা দেয়, যদিও এই ‘ভালো পুলিশেরা’ বাস্তবে কখনোই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি।
গত সপ্তাহে দ্য পোস্টে মার্ক ডুবোউইৎস যেমনটা সতর্ক করেছিলেন—তেহরান এই কৌশলে শেষবারের মতো আরও একটি বড় ধরনের চাল চালতে পারে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ঠিক আগে, অক্টোবর মাসের শেষ দিকে তারা তাদের জমিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সাইবার সক্ষমতা ব্যবহার করে বড় ধরনের এক হামলা চালাতে পারে।
তাদের উদ্দেশ্য থাকবে দুই দেশের ভোটারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যেন ইসরাইলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এতে তারা পেন্টাগনের বাজেট আটকে দেওয়ার সুযোগ পাবে এবং ট্রাম্পকে নতুন কোনো অভিশংসনের জটিলতায় ঝুলিয়ে রাখতে পারবে।
ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের উচিত মার্কিন জনগণকে এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্ক করা। তাদের বুঝিয়ে বলা দরকার যে, ইরান এখন কোনঠাসা হয়ে পড়েছে; তবে তাদের হাতে এখনো কিছু ক্ষমতা বাকি আছে এবং তারা আমাদের মনোবল ভাঙার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
বর্তমানে দুই পক্ষই মুখোমুখি লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে—সুতরাং, ওয়াশিংটনের জন্য এখন পিছিয়ে আসার বা চোখ সরানোর সময় নয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























