গাজা ও ইউক্রেন সংকট, জলবায়ু বিপর্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থবিরতার মতো অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্ব। ঠিক এমনই এক সংকটময় সময়ে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বৈশ্বিক কূটনীতির শীর্ষ পদে।
আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হতে চলায় জাতিসংঘ পাচ্ছে তার দশম মহাসচিব। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থাটির নেতৃত্ব দেবেন।
তবে এবার কেবল আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা নয়, নতুন মহাসচিব নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর রেষারেষি ও স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ভেটো ক্ষমতা।
রেসে এগিয়ে কারা?
জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বিরকেট। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের দ্বিতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটে সব প্রার্থীর মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছেন। ল্যাটিন আমেরিকার জোরালো সমর্থনে শক্ত অবস্থানে আছেন।
ইউএনসিটিএডি (UNCTAD) প্রধান ও কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তিনি প্রথম দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটে শীর্ষে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় সামান্য পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা প্রধান রাফায়েল গ্রোসি (আর্জেন্টিনা)। তিনি অনানুষ্ঠানিক ভোটে ৩য় অবস্থানে রয়েছেন। ইউক্রেন-ইরান পারমাণবিক সংকট সামলানোর অভিজ্ঞতা পুরুষ প্রার্থীদের মধ্যে তাকে সবচেয়ে এগিয়ে রেখেছে।
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান মিশেল বাশেলেত, ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ৭৩তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা অ্যাসপিনোসা, জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও অভিজ্ঞ রাষ্ট্রদূত ইভোনে আ-বাকি, আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাকি সাল এবং উগান্ডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রবীণ কূটনীতিক ওলারা ওতুনু।
জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগ দেয়। তবে এর পেছনে কাজ করে শক্ত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
প্রস্তাবিত প্রার্থীকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত ৯টি ভোট পেতে হবে। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে যেকোনো একটি দেশ বিরোধী ভোট (ভেটো) দিলে প্রার্থীর আশা শেষ।
প্রথম দিকের ভোটে গোপন ব্যালটে মত নেওয়া হলেও চূড়ান্ত ধাপে স্থায়ী সদস্য দেশগুলোকে আলাদা রঙের ব্যালট দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সহজেই ধরা পড়ে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিশ্চিত ভেটো রয়েছে কিনা।
বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম-রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধের কারণে মস্কো বা ওয়াশিংটনের পছন্দের বাইরে কোনো প্রার্থী টিকে থাকা কঠিন। ফলে অনানুষ্ঠানিক ভোটের শীর্ষে থাকলেও স্থায়ী সদস্যদের ঐকমত্য না থাকলে নতুন ‘ডার্ক হর্স’ বা অচেনা সমঝোতামূলক প্রার্থী সামনে চলে আসতে পারে।
জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব পদে দায়িত্ব পাননি। একই সাথে অলিখিত ভৌগোলিক পর্যায়ক্রম অনুযায়ী এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মহাসচিব হওয়ার পালা।
দৌড়ে থাকা ৫ নারী প্রার্থীর শক্ত অবস্থানের কারণে বিশ্বজুড়ে জোরালো দাবি উঠেছে সংস্থাটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধান নির্বাচন করার।
ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিনা লাসেন জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিষদে আরও কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হবে।
যদি স্থায়ী ৫ দেশ কোনো বিদ্যমান প্রার্থীর বিষয়ে একমত হতে না পারে, তবে প্রক্রিয়ার শেষ দিকে সম্পূর্ণ নতুন প্রার্থীর নামও যুক্ত হতে পারে।
চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি হলে সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটে চূড়ান্ত নিয়োগ সম্পন্ন হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















