বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে বড় হয়েছে, কমেছে চরম দারিদ্র্যও। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে পৌঁছায়নি সব মানুষের কাছে। বরং সময়ের সঙ্গে আয়বৈষম্য বেড়েছে, চাপের মুখে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) পঞ্চবার্ষিক স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, ১৯৮৩-৮৪ সালে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষের সম্মিলিত আয়ের প্রায় দেড় গুণ। ২০২২ সালে সেই অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৮ গুণে।
একই সময়ে মোট জাতীয় আয়ে নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের অংশ কমেছে। বিপরীতে শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের অংশ বেড়ে মোট আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি বড় হলেও বাড়তি আয়ের একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়ের মানুষের কাছেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
জিইডির বিশ্লেষণ বলছে, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, দেশে কর্মসংস্থান বাড়িয়েছে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুবিধা সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। বরং মধ্যবিত্তের আয়ের অংশও ২০২২ সালে নিচের দিকে নেমেছে।
এর সঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দারিদ্র্য। ফ্রেমওয়ার্কে উল্লেখ করা গবেষণা অনুযায়ী, মাঝারি দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে।
যদিও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্জনও কম নয়। ১৯৯১-৯২ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। গড় আয়ুও প্রায় ৫০ বছর থেকে বেড়ে ৭৩ বছরে পৌঁছেছে। কমেছে শিশুমৃত্যু, বেড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ।
কিন্তু দারিদ্র্যের ধরনও বদলেছে। এখন শুধু আয় নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, ডিজিটাল সুবিধা এবং জলবায়ু ঝুঁকিও পরিবারের আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করছে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা অনেক পরিবারও অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা মূল্যস্ফীতির মতো একটি বড় ধাক্কাতেই আবার দরিদ্র হয়ে পড়তে পারে।
দ্রুত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। শহরের বড় একটি জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিক ও কম মজুরির কাজে যুক্ত। তাদের অনেকেরই চাকরির নিরাপত্তা বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। ফলে মূল্যস্ফীতি বা অর্থনৈতিক মন্দার চাপ সরাসরি পড়ে এসব পরিবারের ওপর।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান বাড়ানো, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















