পশ্চিবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় জরাজীর্ণ ভবনগুলোতেই গড়ে উঠেছে বহু আবাসিক হোটেল। বেশিরভাগ হোটেলে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার পথও সরু; আর এসব ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই থাকছেন বাংলাদেশি পর্যটকরা।
হেরিটেজ ভবন হওয়ায় সংস্কার করা কঠিন—এমন অজুহাতে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে অনেক হোটেলেই চলছে ব্যবসা। বুধবার (১৯ আগস্ট) অগ্নিকাণ্ডে ৭ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের প্রাণহানির পর সামনে এসেছে নিউমার্কেট এলাকার হোটেলগুলোর ভয়াবহ নিরাপত্তা চিত্র।
নিহতরা হলেন—কুষ্টিয়ার আরুয়াপাড়ার বাসিন্দা দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), তাদের তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত ও দেবাশীষের শ্বশুর মো. আকরাম আলী (৬৪) এবং সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ী এলাকার আহমেদ বাবু (৩০), সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান। আর ভারতের নিহত দুজন হলেন—ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাসওয়ান ও শিলিগুড়ির যোগ নারায়ণ আগারওয়াল।
নিহত দেবাশীষ দত্ত দৈনিক আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৫ দিন আগে দেবাশীষসহ পরিবারের চারজন চিকিৎসার জন্য ভারতের কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন।
চিকিৎসা করিয়ে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) তারা বিমানে কলকাতায় ফিরেছিলেন। বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। তাদের মৃত্যুসংবাদে শোকের ছায়া নেমেছে এসেছে পরিবারে। দেবাশীষের আট বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান দাদা-দাদুর সঙ্গে কুষ্টিয়ায় রয়েছে।
সাভারের নিহত আহমেদ বাবু কসমেটিক দোকানের মালপত্র কিনতে কলকাতায় গিয়েছিলেন। তার আট বছরের একটি কন্যা ও পাঁচ বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। তার মৃত্যুর খবরে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মির্জা গালিব স্ট্রিট থেকে মার্কুইস স্ট্রিটের মূল সড়ক ধরে এগোলেই দেখা মেলে ছোট, বড় ও মাঝারি নানা হোটেলের। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এসব জরাজীর্ণ ভবনেই গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল। কোথাও নতুন করে পলেস্তারা দেওয়া হয়েছে, কোথাও গ্রিল দিয়ে কোনো রকমে আটকে রাখা হয়েছে এসির আউটডোর ইউনিট। সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের সংযোগকারী তারও।
অতিপরিচিত একটি হোটেলে গিয়ে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার খোঁজ নিলে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক মনে হয়। তবে একটু ভেতরের দিকে গেলেই চিত্র বদলে যায়। তুলনামূলক কম ভাড়ার এসব হোটেলে মূলত বাংলাদেশি পর্যটকরাই থাকেন।
কলিন স্ট্রিটের একটি হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, সরু প্রবেশপথের ভেতরে আবাসিক হোটেলের অভ্যর্থনাকেন্দ্রে বসে আছেন ম্যানেজার। তবে তিনি অগ্নিনির্বাপণ দপ্তরের কোনো লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। হোটেলটির লিফটও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একসঙ্গে দুজনের বেশি সেখানে ওঠার সুযোগ নেই। ওই হোটেলে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি পর্যটক জানিয়েছেন, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসায় কম খরচে থাকার চেষ্টা করেন তারা।
এক বাংলাদেশি পর্যটক বললেন, ‘আমরা চিকিৎসার জন্য আসি। আমরা তো বাধ্য, কীভাবে নিরাপদে থাকতে পারি, কীভাবে অল্প খরচে থাকতে পারি, যাতে চিকিৎসার ব্যয় করতে পারি। ভিনদেশে এসে কয়টা টাকা বাঁচানোর জন্যেই কমদামি হোটেলে থাকি আমরা।’
মার্কুইস স্ট্রিটের আরেকটি হোটেলে ঢুকেও একই চিত্র দেখা যায়। হোটেলের নিচে ব্যবসা করেন এমন দুজন ভারতীয়ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে থাকার কথা জানান। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বললেন, ‘একটা ফ্ল্যাট আছে, চারটা রুম করে হোটেল করে নিয়েছে। আশঙ্কা আছে। এই যে তারগুলো আছে, এগুলো থেকে একটু ঝুঁকি আছে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রায় ৩০০ ছোট-বড় আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের মূল গ্রাহক বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটকেরা। কিন্তু যাদের ঘিরে এসব হোটেলের ব্যবসা, তাদের জীবনই কেন এমন ঝুঁকিতে- এ প্রশ্ন করছেন খোদ স্থানীয়রাই।
হোটেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হায়দার আলি খান বললেন, প্রশাসন এখানে যে সহযোগিতা চাইবে, তারা তা করবেন। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে হোটেল মালিকদেরও সহযোগিতা করতে হবে। কারণ, হাত গুটিয়ে বসে থাকলে একের পর এক মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।
কলকাতা পৌরসভার প্রশাসক স্মিতা পান্ডে বললেন, আগের ঘটনার পরই একটি যৌথ টিম গঠন করা হয়েছিল। এবার পুরো কলকাতা পৌর এলাকার হোটেলগুলোতে অডিট ও পরিদর্শন করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে দেওয়া যায় না। আইনের বিভিন্ন বিধান এবার কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুরোনো ও হেরিটেজ ভবন হওয়ায় মূল কাঠামোগত পরিবর্তন বা সংস্কার করা কঠিন—এমন অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। তবে বুধবার কলকাতার বাংলাদেশি অধ্যুষিত হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৭ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের প্রাণহানির পর প্রশ্ন উঠেছে; এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলগুলোর দায় আসলে কার?
এদিকে দুর্ঘটনার পর পরই নড়েচড়ে বসেছে কলকাতা পুলিশের লালবাজার গোয়েন্দা বিভাগ। ঘটনার পেছনে থাকা অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগে গঠন করা হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। পুলিশি অভিযানের শুরুতেই এন্টালি মার্কেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হোটেল ‘শিখা ইন’-এর লিজ় হোল্ডার বা ইজারা গ্রহীতা আবু জাফরকে। এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার সন্দেহে আরও দু’জনকে আটক করে তীব্র জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ।
জানা গেছে, মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনের মাত্র ১১০০ বর্গফুটের সংকীর্ণ জায়গায় বেআইনিভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘শিখা ইন’ হোটেলটি। একটি দুটি কামরার ফ্ল্যাটের সমান জায়গায় কাঠের বেড়া দিয়ে খুপরি খুপরি পাঁচটি ঘর তৈরি করে সেখানে অবস্থান করতেন অতিথিরা।
ভবনটিতে ফায়ার সেফটি বা অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থার কোনো সঠিক বাস্তবায়ন ছিল না। আবাসিক ভবনকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তর করে অতিথি নিবাস চালানো হচ্ছিল বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় প্রশাসন এবং দমকল বিভাগের একদম নাকের ডগায় এমন বেআইনি কার্যকলাপ এতদিন ধরে কীভাবে চলছিল, তা নিয়ে এখন জোর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল মালিক বীরেশ্বর মিত্রের সন্ধান পেতে বর্তমানে একাধিক টিম কাজ করছে। আটক অন্য দুজন ব্যক্তির মধ্যে নিকটবর্তী অন্য একটি হোটেলের কর্মচারীও রয়েছেন, যা ঘটনার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশের বড় ইঙ্গিত দেয়।
সার্বিক নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে কীভাবে এই ধরণের মৃত্যুফাঁদ দীর্ঘদিন ধরে সচল ছিল, তা খতিয়ে দেখে দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















