বৃষ্টি নামলেই গাজার আকাশ আজকাল বড্ড ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু বৃষ্টির যে নিজস্ব একটা তোলপাড় করা সুর থাকে, আজ আর তা গাজার মানুষের কানে পৌঁছায় না। ড্রোন আর সাইরেনের শব্দে কান পাতা দায় যে শহরে, সেখানে কোনো সুরের জায়গা নেই।
নুসাইরাত ক্যাম্পের এক কোণে, ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাওয়া তিনতলা বাড়িটার বাঁ-পাশের দেয়ালটা অদ্ভুতভাবে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের গায়ে লাল-সাদা রঙে আঁকা একটা ছোট ফিলিস্তিনি পতাকা, আর তার পাশে ধূলিমলিন একটা সাইকেল। সাইকেলটার পেছনে ঝুলছে নীল রঙের একটা স্কুলব্যাগ। ব্যাগের চেইনটা আধখোলা, ভেতর থেকে উঁকি মারছে আধপোড়া একটা ভূগোলের বই।
নাইন বছরের শিশু ইউসুফ এই দেয়ালটার পাশেই বসে ছিল। তার ছোট্ট হাতে একটা ভাঙা রঙিন পেন্সিল। যে মাটি থেকে একটু আগেও ধোঁয়া উঠছিল, সেই খসখসে কংক্রিটের ওপরেই সে আঁকার চেষ্টা করছে একটা ছোট্ট সবুজ গাছ, আর একটা উড়ন্ত সাদা পায়রা।
‘ইউসুফ, ওখানে কী করছিস বাবা?’ পেছন থেকে ভাঙা গলায় ডেকে উঠলেন তার মা। এক চোখে জল, অন্য চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি নিয়ে তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন রান্নার কোনো সস্তা থালা-বাসন।
ইউসুফ না তাকিয়েই বলল, ‘মা, আমাদের বাড়িটা যখন আবার তৈরি হবে, জানালাটা কোন দিকে হবে জানো? যেদিক থেকে আলো আসে! আমি ভূগোলের বইয়ে পড়েছি, সূর্যের আলো কখনো আটকে রাখা যায় না।’
মা আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। শুধু হাঁটু গেড়ে বসে জড়িয়ে ধরলেন ইউসুফকে। গাজা নদীর ওপর দিয়ে তখন একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে অচিন দেশের উদ্দেশ্যে। কোনো সীমানা, কোনো বিধিনিষেধ তাদের আটকাতে পারছে না।
ইউসুফ মায়ের বুকে মাথা রেখে সেই মুক্ত আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। ধ্বংসস্তূপের নিচে তাদের সমস্ত ভবিষ্যৎ হয়তো চাপা পড়ে গেছে, কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের ওপরে দাঁড়িয়েও জীবনকে ভালোবাসার যে অদম্য জেদ—তা এই পৃথিবীর কোনো শক্তির পক্ষেই কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























