চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ও প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ঢাকা-দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। একদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আবেগ, বিচারিক মর্যাদা ও ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা; অন্যদিকে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন আস্থার সংকট। জমাট বাঁধা এই বরফ গলাতে কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিনই দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লির এফসিসি সাউথ এশিয়ার অনলাইনে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। যদিও ভারত সরকার দাবি করেছে—এই আয়োজনের সাথে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, তবুও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই দায় এড়ানোর অবস্থান ঢাকার ক্ষোভ কমাতে পারেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি স্পষ্ট: দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণ ও আস্থার ঘাটতি পূরণ না করে কূটনৈতিক সম্পর্কের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত যদি তাদের পুরোনো মিত্রকে বারবার রাজনৈতিক স্পেস ও সুরক্ষার বার্তা দেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সঙ্গে নয়াদিল্লির সুসম্পর্ককে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
উত্তেজনা প্রশমন ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে গত সোমবার ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ সৃষ্টি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় অগ্রগতি থমকে থাকবে। তবে বৈঠক শেষে ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক হলে বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব।
একইদিন, দুপুরে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় দূত। এর আগে, রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন দীনেশ ত্রিবেদী।
একই ধারাবাহিকতায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ঢাকা সফর করেন। তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম ও ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ‘র’ প্রধানের এই সফর চীন থেকে ঢাকায় আসার নিয়মিত একটি কার্যক্রমের অংশ, এটি নিয়ে নতুন করে জল্পনা-কল্পনার কিছু নেই।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে তিনি মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে সাক্ষাতে তারা কী নিয়ে আলোচনা করেছে সেটি জানা যায়নি।

একইদিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত এপ্রিলে ভারত সরকার তাদের ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় নিয়োগ দিয়েছে সাবেক রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার করে পাঠিয়েছে। নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে দীনেশ ত্রিবেদী ৫ জুন পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা কোনো বাহ্যিক শক্তির দান ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের ফসল। তবে কৌশলগত কারণে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল, যাতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত ও ‘চিকেন নেক’ (শিলিগুড়ি করিডর)-এর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয় এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের আড়াই-ফ্রন্ট সামরিক চ্যালেঞ্জ কমে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর পর বর্তমানে এসে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বড় রূপান্তর এনেছে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু তা হতে হবে কোনো আধিপত্যবাদী বা একপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, পারস্পরিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সমমর্যাদার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।
ফলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক বর্তমানে এক ঐতিহাসিক পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে। একদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণের গণআকাঙ্ক্ষা ও বিচার বিভাগীয় মর্যাদা রক্ষা করা বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব; অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন অক্ষুণ্ন রাখা ভারতের জন্য জরুরি। ভারত সরকার নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক মিত্রের মোহ কাটিয়ে গণআকাঙ্ক্ষাকে কতটুকু মর্যাদা দেবে—তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের আসল রূপ।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন হতে যাচ্ছে। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফরটি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বরফ সম্পূর্ণ গলাতে এবং সরাসরি আলোচনায় বসার একটি মোক্ষম সুযোগ হতে পারে।

তবে এই সফর এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে এর আগে ভারত সরকার ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ এবং দণ্ডিত আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে কতটা দৃশ্যমান ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের একটি সতর্কবার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন— ভারত যদি বারবার তাদের পুরোনো মিত্রকে রাজনৈতিক স্পেস ও সুরক্ষার বার্তা দিতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সাথে নয়াদিল্লির আস্থাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তবে দেশের বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমদ মনে করেন, সরকারের উচিত অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া।
তবে হুমায়ুন কবিরের মতে, সরকারের বর্তমান অবস্থান দেশের সাধারণ মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা ও আবেগেরই সঠিক প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তবে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জনগণের আবেগ, বিচারিক মর্যাদা এবং ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই দুই দেশের কূটনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















