০৮:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

রাজপথে দাপাচ্ছে লক্কড়ঝক্কড় বাস, ভোগান্তি চরমে

The gallery was not found!

মাথার ওপর দিয়ে ঝকঝকে মেট্রোরেল সাঁই সাঁই করে ছুটছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দামি গাড়ির মেলা। আর ঠিক নিচেই রাজপথে সগর্বে বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লক্কড়ঝক্কড় বাস।

জানালার কাচ উধাও, বডিতে মরিচার শৈল্পিক আলপনা, আর হেডলাইটের সলতে পাকানোর অবস্থা। এসব বাস দেখলে মনে হয়, এরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো রণাঙ্গন থেকে সরাসরি ঢাকার রাস্তায় নেমে আসা জীবন্ত ইতিহাস।

ঢাকা এখন আধুনিক শহর। মেট্রোরেল আছে, উড়ালসড়ক আছে, এক্সপ্রেসওয়ে আছে। বিদেশিরা এলে এগুলো বুক ফুলিয়ে দেখানো যায় । কিন্তু একটু সরে এসে যদি লোকাল বাসে উঠতে যান — সেখানে ভিন্ন এক বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, ঢাকায় নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা প্রায় ৫৪ হাজার। এর মধ্যে ১৬ হাজারের বয়স ২০ বছরের বেশি। সরকার নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পার করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ বাস আইনত রাস্তায় থাকার কথা নয়। তারপরও আছে। দিব্যি আছে।

গত ২৫ জুলাই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সভায় জানানো হয়েছে, ঢাকায় এক হাজারের বেশি বাসের বৈধ ফিটনেস সনদ নেই। অনুমোদিত রুট আছে ৪১৮টি, সচল মাত্র ৯৮টি।

ঢাকার বাসে উঠলে প্রথম যে অভিজ্ঞতা হয় সেটা হলো — হেলপার আপনাকে টেনে তুলবে, বাস তখনো চলছে। নামতে চাইলে নামিয়ে দেবে কিন্তু — বাস তখনও চলছে। মাঝখানে আপনি ঝুলে থাকবেন, না উঠলেন না নামলেন।

বাসের ভেতরে গেলে সিট পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। পেলেও সেই সিটের স্প্রিং আপনার মেরুদণ্ডের সাথে যুদ্ধ করতে পারে। চালক সাহেব একহাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে ফোন। মাঝেমধ্যে হর্ন — “পেঁ পেঁ”, “পোঁ পোঁ”।

ঢাকার বাসের কালো ধোঁয়া নিয়ে লেখালেখি হয়েছে অনেক, প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা বইলেও দৃশ্যমান সুফল থেকে বঞ্চিত নগরবাসী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিমানবন্দর এলাকায় কালো ধোঁয়া ও শব্দদূষণের বিরুদ্ধে অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৭টি মামলা করে। ফেব্রুয়ারিতে শ্যামলীতে একই অভিযোগে আরও ছয়টি মামলা হয়।

যাদের একটু সামর্থ্য আছে তারা বাসে উঠছেন না। উবার আছে, পাঠাও আছে, রিকশা আছে। যানজটে বসে থাকলেও অন্তত কিছুটা স্বস্তি মেলে এসবে। কিন্তু যারা নিরুপায়, তারা প্রতিদিন সেই লক্কড়ঝক্কড় বাসে উঠছেন। স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

সরকার এখন রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা আর বৈদ্যুতিক বাসের কথা বলছে। পরিকল্পনার কমতি নেই। ২০২৫ সালে অভিযান শুরুর প্রথম দিনেই ৪৯৫টি মামলা হয়েছে। তারপর এক বছর পরেও হাজারের বেশি ফিটনেসবিহীন বাস রাস্তায়। অর্থাৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, অভিযান হচ্ছে — কিন্তু সমাধান মিলছে না।

গণপরিবহনের বড় অংশ যদি এখনো ভাঙা কাচ, কালো ধোঁয়া, বেপরোয়া গতি আর যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারেই আটকে থাকে, তাহলে শহর এগিয়ে গেলেও জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ, চলাচলের নিরাপত্তাও আটকে থাকবে অনন্তকাল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশ ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর

Business Times24

রাজপথে দাপাচ্ছে লক্কড়ঝক্কড় বাস, ভোগান্তি চরমে

Update Time : ০৯:৫৫:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

মাথার ওপর দিয়ে ঝকঝকে মেট্রোরেল সাঁই সাঁই করে ছুটছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দামি গাড়ির মেলা। আর ঠিক নিচেই রাজপথে সগর্বে বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লক্কড়ঝক্কড় বাস।

জানালার কাচ উধাও, বডিতে মরিচার শৈল্পিক আলপনা, আর হেডলাইটের সলতে পাকানোর অবস্থা। এসব বাস দেখলে মনে হয়, এরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো রণাঙ্গন থেকে সরাসরি ঢাকার রাস্তায় নেমে আসা জীবন্ত ইতিহাস।

ঢাকা এখন আধুনিক শহর। মেট্রোরেল আছে, উড়ালসড়ক আছে, এক্সপ্রেসওয়ে আছে। বিদেশিরা এলে এগুলো বুক ফুলিয়ে দেখানো যায় । কিন্তু একটু সরে এসে যদি লোকাল বাসে উঠতে যান — সেখানে ভিন্ন এক বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, ঢাকায় নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা প্রায় ৫৪ হাজার। এর মধ্যে ১৬ হাজারের বয়স ২০ বছরের বেশি। সরকার নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পার করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ বাস আইনত রাস্তায় থাকার কথা নয়। তারপরও আছে। দিব্যি আছে।

গত ২৫ জুলাই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সভায় জানানো হয়েছে, ঢাকায় এক হাজারের বেশি বাসের বৈধ ফিটনেস সনদ নেই। অনুমোদিত রুট আছে ৪১৮টি, সচল মাত্র ৯৮টি।

ঢাকার বাসে উঠলে প্রথম যে অভিজ্ঞতা হয় সেটা হলো — হেলপার আপনাকে টেনে তুলবে, বাস তখনো চলছে। নামতে চাইলে নামিয়ে দেবে কিন্তু — বাস তখনও চলছে। মাঝখানে আপনি ঝুলে থাকবেন, না উঠলেন না নামলেন।

বাসের ভেতরে গেলে সিট পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। পেলেও সেই সিটের স্প্রিং আপনার মেরুদণ্ডের সাথে যুদ্ধ করতে পারে। চালক সাহেব একহাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে ফোন। মাঝেমধ্যে হর্ন — “পেঁ পেঁ”, “পোঁ পোঁ”।

ঢাকার বাসের কালো ধোঁয়া নিয়ে লেখালেখি হয়েছে অনেক, প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা বইলেও দৃশ্যমান সুফল থেকে বঞ্চিত নগরবাসী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিমানবন্দর এলাকায় কালো ধোঁয়া ও শব্দদূষণের বিরুদ্ধে অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৭টি মামলা করে। ফেব্রুয়ারিতে শ্যামলীতে একই অভিযোগে আরও ছয়টি মামলা হয়।

যাদের একটু সামর্থ্য আছে তারা বাসে উঠছেন না। উবার আছে, পাঠাও আছে, রিকশা আছে। যানজটে বসে থাকলেও অন্তত কিছুটা স্বস্তি মেলে এসবে। কিন্তু যারা নিরুপায়, তারা প্রতিদিন সেই লক্কড়ঝক্কড় বাসে উঠছেন। স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

সরকার এখন রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা আর বৈদ্যুতিক বাসের কথা বলছে। পরিকল্পনার কমতি নেই। ২০২৫ সালে অভিযান শুরুর প্রথম দিনেই ৪৯৫টি মামলা হয়েছে। তারপর এক বছর পরেও হাজারের বেশি ফিটনেসবিহীন বাস রাস্তায়। অর্থাৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, অভিযান হচ্ছে — কিন্তু সমাধান মিলছে না।

গণপরিবহনের বড় অংশ যদি এখনো ভাঙা কাচ, কালো ধোঁয়া, বেপরোয়া গতি আর যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারেই আটকে থাকে, তাহলে শহর এগিয়ে গেলেও জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ, চলাচলের নিরাপত্তাও আটকে থাকবে অনন্তকাল।