উত্তর কোরিয়ার সাইবার সক্ষমতা এখন আর কেবল তথ্য চুরি বা প্রযুক্তিগত নাশকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নেওয়া, অর্থ পাচার এবং সেই অর্থ সামরিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের অভিযোগে দেশটি নতুন করে বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বাইন্যান্স হ্যাকের ঘটনায় উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে অন্যতম সংগঠিত ও দক্ষ অপরাধী গোষ্ঠী। তাদের বিশেষত্ব শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতা খুঁজে বের করা নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, কর্মীদের ভূমিকা এবং অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো।
বাইন্যান্সে রেকর্ড চুরি, সন্দেহের কেন্দ্রে ট্রেডারট্রেইটর
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ অক্টোবর সংঘটিত এ হামলায় মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের বিশ্লেষণে হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার ‘ট্রেডারট্রেইটর’ গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রাথমিক তদন্তে বাইন্যান্সের একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পরবর্তী অনুসন্ধানে একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতার তথ্য পাওয়া যায়। ১০টি ব্লকচেইনে থাকা বিভিন্ন ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ শনাক্ত ও আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের দক্ষতার বড় কারণ তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সংগঠিত কার্যক্রম এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর ধারণা। তারা শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা করে না, বরং প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের লক্ষ্য করে প্রতারণামূলক যোগাযোগ ও ক্ষতিকর সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে।
সোফোসের হুমকি গবেষণাবিষয়ক পরিচালক রাফে পিলিংয়ের মতে, অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী বিশেষভাবে দক্ষ। ২০২২ সালে এফবিআই, সিআইএসএ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ও ট্রেডারট্রেইটরসহ উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছিল।
চুরি করা অর্থে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর অভিযোগ
উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপরাধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় ব্যবহার। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের প্রচলিত পথ সীমিত হয়ে পড়ায় পিয়ংইয়ং সাইবার অপরাধকে বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।
চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও অর্থ পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাইবার নিরাপত্তা গবেষক মাইকেল বার্নহার্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অর্থ পাচারে চীনের সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার নাগরিকেরা পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিচ্ছেন। এসব চাকরি থেকে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পাশাপাশি সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের কাজেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি ও অর্থ পাচার উত্তর কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কেও নতুন মাত্রা
উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপরাধের বিষয়টি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সামরিক সহযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়াকে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বার্নহার্টের অভিযোগ, সাইবার অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ দেশটির সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে।
এআই বাড়াচ্ছে সাইবার ঝুঁকি
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার সাইবার অপরাধের ঝুঁকি নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রেস ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী বার্নার্দো ব্রিটেসের মতে, এআইয়ের সাহায্যে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হালনাগাদ করার আগেই হামলার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাইন্যান্সে হামলা শুধু একটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের আর্থিক ক্ষতির ঘটনা নয়। এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















