যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ এবং ভোক্তা ব্যয় অব্যাহত থাকায় পণ্য আমদানি বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এতে সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে ১৩৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানি বৃদ্ধির গতি কম থাকায় তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাণিজ্য বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আদমশুমারি ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চের পর এটি সর্বোচ্চ ঘাটতি। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদেরা ঘাটতি ১৩০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৩৪৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে পণ্য রপ্তানি ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ২০৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে আমদানি
আমদানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মূলধনি পণ্যের চাহিদাকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকেরা। সেপ্টেম্বরে মূলধনি পণ্যের আমদানি আগের মাসের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে আমদানি বেড়েছে ৭৭ দশমিক ২ শতাংশ।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ হার্ডওয়্যার ও যন্ত্রপাতি আমদানি করছে। স্যানট্যান্ডার ইউএস ক্যাপিটাল মার্কেটসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ স্টিফেন স্ট্যানলি বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারের বড় অংশ বিদেশ থেকে আসায় বাণিজ্য ঘাটতি ব্যাপকভাবে বাড়ছে।
ভোক্তা ব্যয়েও বাড়ছে আমদানি
এআই খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয় শক্তিশালী রয়েছে। এর ফলে বিদেশি পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের আমদানি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে শিল্পের কাঁচামাল ও সরবরাহসামগ্রীর আমদানি ৬ শতাংশ কমেছে। খাদ্যপণ্য ও মোটরযান আমদানিতেও পতন দেখা গেছে।
রপ্তানির ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের চালান ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। মূলধনি পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভোগ্যপণ্যের রপ্তানি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে মোটরযান ও শিল্পসামগ্রীর রপ্তানি কমেছে।
প্রবৃদ্ধিতে বাণিজ্যের চাপ
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদেরা বাণিজ্যের কারণে প্রবৃদ্ধি চার শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত কমতে পারে বলে অনুমান করেছেন। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের হিসাব অনুযায়ী, এ প্রভাব হতে পারে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
টানা তিন প্রান্তিক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাণিজ্য ইতিবাচক অবদান রাখতে পারেনি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি সব ক্ষেত্রে অর্থনীতির দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় না। এআই খাতে বিনিয়োগ এবং ভোক্তা ব্যয়ের শক্তিশালী অবস্থানও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ন্যাশনওয়াইডের অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ভিলহাবেরের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করলেও এটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ের গতিশীলতারও প্রতিফলন হতে পারে।
এদিকে সেপ্টেম্বরে পাইকারি পর্যায়ে মজুত ০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। মোটরযান ও যন্ত্রাংশ বিক্রেতাদের মজুত বেড়েছে ০ দশমিক ২ শতাংশ। আমদানি করা কিছু পণ্য অবিক্রীত অবস্থায় মজুত থাকায় জিডিপিতে বাণিজ্য ঘাটতির তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের প্রাথমিক জিডিপি প্রতিবেদনে এআই খাতে বিনিয়োগের উল্লম্ফন এবং শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয়ের কারণে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ভালো থাকার প্রত্যাশা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















