০৩:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

সময় পেরিয়ে সুরের টানে, চার দশক পরও এক সুতোয় প্রমিথিউস

The gallery was not found!

কিছু গান কেবল শোনা যায় না, অনুভব করা যায়। কিছু বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না, বরং স্মৃতির ভাঁজে আরও গভীর হয়ে ওঠে। আর কিছু সম্পর্কের সুতো বোনা থাকে গিটার, ড্রামস, স্টুডিওর ব্যস্ততা আর একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার দিনগুলো দিয়ে। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের পরিচিত নাম ‘প্রমিথিউস’-এর সাবেক সদস্যদের সাম্প্রতিক পুনর্মিলনী যেন সেই গল্পই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর আর্টিস্ট ক্লাবে বসেছিল প্রমিথিউসের পুরোনো সদস্যদের এক আন্তরিক আড্ডা। কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, ছিল না দীর্ঘ প্রস্তুতি কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চ। ছিল একসঙ্গে বসার আনন্দ, পুরোনো দিনের গল্প আর বহুদিন পর কাছের মানুষদের মুখোমুখি হওয়ার উচ্ছ্বাস। চার দশকের সংগীতযাত্রায় ছড়িয়ে পড়া মানুষগুলো আবারও মিলেছিলেন একই টানে—সংগীত ও বন্ধুত্বের টানে।

হঠাৎ আড্ডা, অথচ স্মৃতির আয়োজনে পূর্ণ

ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট রেজওয়ান মাত্র ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁর এই স্বল্প সময়ের দেশে আসাকে কেন্দ্র করেই পুরোনো সদস্যদের একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ব্যান্ডটির সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার আনিসুজ্জামান আনিসের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্নভোজ ও আড্ডার।

সেই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন রেজওয়ান, বেজিস্ট বুলবুল, ড্রামার কোয়েল, গিটারিস্ট অপু, কিবোর্ডিস্ট পল্লব এবং সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার আনিসুজ্জামান আনিস। প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রমিথিউসের পথচলার কোনো না কোনো অধ্যায়। তাঁদের একসঙ্গে বসার মধ্য দিয়ে ফিরে আসে ব্যান্ডটির শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি, সৃষ্টির নেপথ্যের গল্প আর সংগীতকে ঘিরে কাটানো জীবনের মূল্যবান সময়।

কোনো আনুষ্ঠানিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে নয়, বরং খাবার টেবিল ঘিরে চলা সহজ-স্বাভাবিক কথোপকথনেই যেন প্রাণ ফিরে পায় পুরোনো দিনগুলো। স্মৃতির দরজা খুলে গেলে সময়ের ব্যবধান অনেকটাই মুছে যায়। পরিচিত মুখ, চেনা হাসি আর পুরোনো অভিজ্ঞতার গল্পে আড্ডা হয়ে ওঠে আবেগঘন।

১৯৮৬ থেকে চার দশকের সংগীতযাত্রা

১৯৮৬ সালে যাত্রা শুরু করা প্রমিথিউস বাংলা রক ও পপ সংগীতের বিকাশে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। দীর্ঘ চার দশকের পথচলায় ব্যান্ডটি প্রকাশ করেছে প্রায় ২০টি অ্যালবাম। সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন, শ্রোতার রুচি ও প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে; বদলেছে গান শোনা ও প্রকাশের মাধ্যমও। কিন্তু প্রমিথিউসের গান ঘিরে শ্রোতাদের স্মৃতি এবং ব্যান্ডটির নিজস্ব পরিচয় রয়ে গেছে স্বতন্ত্র।

‘মিলনের রক্ত’, ‘নির্জন শালবনে’, ‘স্বাধীনতা চাই’, ‘মুক্তির প্রত্যাশায়’, ‘প্রজন্মের সংগ্রাম’, ‘যোদ্ধা’ ও ‘স্মৃতির কপাট’—গানগুলোর নাম উচ্চারণ করলেই অনেক শ্রোতার মনে ভেসে উঠতে পারে জীবনের কোনো বিশেষ সময়, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস কিংবা ফেলে আসা দিনের অনুভূতি।

একটি ব্যান্ডের ইতিহাস কেবল অ্যালবামের সংখ্যা কিংবা জনপ্রিয় গানের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শিল্পীদের শ্রম, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সৃষ্টির আনন্দ, মতপার্থক্য সামলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। প্রমিথিউসের চার দশকের যাত্রাও তেমন অসংখ্য মুহূর্তের সমষ্টি। বনানীর আড্ডায় সেই পথচলার নানা স্মৃতি আবারও আলোচনায় আসে।

স্মৃতির আড্ডায় অনুপস্থিতিরও আলাদা ভাষা

পুনর্মিলনীতে উপস্থিত সদস্যদের আনন্দের পাশাপাশি ছিল দুজন গুরুত্বপূর্ণ সহশিল্পীর অনুপস্থিতি। দেশের বাইরে অবস্থান ও সময়ের ব্যবধানের কারণে অনলাইনে যুক্ত হতে পারেননি ব্যান্ডের প্রধান ভোকালিস্ট বিপ্লব এবং প্রতিষ্ঠাতা ও লিড গিটারিস্ট আরিফ।

তাঁরা উপস্থিত না থাকলেও আলোচনায় উঠে আসে তাঁদের কথা, তাঁদের অবদান এবং ব্যান্ডটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে সংগীতচর্চা করা মানুষদের সম্পর্কের গভীরতা বোধ হয় এমনই—শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও স্মৃতির আলোচনায় তাঁদের জায়গা অটুট থাকে।

একটি ব্যান্ডের পরিচয় গড়ে ওঠে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। কেউ কণ্ঠে গানকে প্রাণ দেন, কেউ গিটারের সুরে তৈরি করেন আবহ, কেউ তাল ধরে রাখেন ড্রামসে, কেউ বেজ বা কিবোর্ডে যোগ করেন নিজস্ব মাত্রা। এর বাইরে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মানুষদের অবদানও সংগীত নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রমিথিউসের পুনর্মিলনী সেই সম্মিলিত যাত্রার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

বদলে গেছে সময়, বদলায়নি বন্ধনের উষ্ণতা

জীবনের নিয়মেই সময়ের সঙ্গে মানুষের পথ আলাদা হয়ে যায়। কেউ থাকেন দেশে, কেউ পাড়ি জমান বিদেশে। পেশাগত ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত জীবন এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে নিয়মিত দেখা করাও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রমিথিউসের সাবেক সদস্যদের জীবনেও এসেছে এমন পরিবর্তন।

তবু একসময় একসঙ্গে গান করা, মহড়ায় সময় কাটানো কিংবা স্টুডিওতে নতুন সৃষ্টির অপেক্ষায় থাকার অভিজ্ঞতা তাঁদের পরস্পরের সঙ্গে অদৃশ্য এক বন্ধনে বেঁধে রেখেছে। সেই বন্ধনকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বনানীর এই অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলা।

এ ধরনের পুনর্মিলনীর বিশেষত্ব এখানেই—এখানে কে কতটা জনপ্রিয়, কার অর্জন কত বড়, কিংবা কে এখন কোথায় আছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একসঙ্গে কাটানো সময়। পুরোনো দিনের একটি ঘটনা, পরিচিত কোনো সুর কিংবা অতীতের ছোট্ট কোনো স্মৃতি মুহূর্তেই ফিরিয়ে আনতে পারে বহু বছর আগের অনুভূতি।

গান শেষ হয়, স্মৃতি নয়

প্রমিথিউসের এই পুনর্মিলনী ছিল না কোনো নতুন অ্যালবাম প্রকাশের অনুষ্ঠান কিংবা বড় মঞ্চের সংগীত আয়োজন। তবু এর গুরুত্ব কম নয়। কারণ, একটি ব্যান্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের পেছনে থাকা মানুষগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

চার দশকের পথচলায় প্রমিথিউস রেখে গেছে গান, স্মৃতি ও নিজস্ব সংগীতপরিচয়। আর সদস্যদের মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব সেই যাত্রাকে দিয়েছে মানবিক মাত্রা। বনানীর আর্টিস্ট ক্লাবের আড্ডা তাই কেবল কয়েকজন সাবেক সদস্যের একত্র হওয়া নয়; এটি ছিল নিজেদের অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া, পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে ছুঁয়ে দেখা এবং সংগীতের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনাড়ম্বর উপলক্ষ।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে যায়। বদলে যায় ঠিকানা, জীবনের ব্যস্ততা, মানুষের চলার পথ। কিন্তু কোনো গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি কিংবা একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার দিনগুলো সহজে মুছে যায় না। প্রমিথিউসের সদস্যদের এই মিলনমেলা যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রতিচ্ছবি—গানের সুর থেমে যেতে পারে, মঞ্চের আলো নিভে যেতে পারে, কিন্তু সংগীতের বন্ধন থেকে যায়।

চার দশক পরও তাই প্রমিথিউসের গল্প শুধু গানের গল্প নয়; এটি বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকা এক সম্পর্কের গল্প।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি ডিসেম্বরে, বোর্ডের প্রথম সভা শেষে জানালেন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা

Business Times24

সময় পেরিয়ে সুরের টানে, চার দশক পরও এক সুতোয় প্রমিথিউস

Update Time : ০৫:৪০:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

কিছু গান কেবল শোনা যায় না, অনুভব করা যায়। কিছু বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না, বরং স্মৃতির ভাঁজে আরও গভীর হয়ে ওঠে। আর কিছু সম্পর্কের সুতো বোনা থাকে গিটার, ড্রামস, স্টুডিওর ব্যস্ততা আর একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার দিনগুলো দিয়ে। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের পরিচিত নাম ‘প্রমিথিউস’-এর সাবেক সদস্যদের সাম্প্রতিক পুনর্মিলনী যেন সেই গল্পই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর আর্টিস্ট ক্লাবে বসেছিল প্রমিথিউসের পুরোনো সদস্যদের এক আন্তরিক আড্ডা। কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, ছিল না দীর্ঘ প্রস্তুতি কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চ। ছিল একসঙ্গে বসার আনন্দ, পুরোনো দিনের গল্প আর বহুদিন পর কাছের মানুষদের মুখোমুখি হওয়ার উচ্ছ্বাস। চার দশকের সংগীতযাত্রায় ছড়িয়ে পড়া মানুষগুলো আবারও মিলেছিলেন একই টানে—সংগীত ও বন্ধুত্বের টানে।

হঠাৎ আড্ডা, অথচ স্মৃতির আয়োজনে পূর্ণ

ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট রেজওয়ান মাত্র ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁর এই স্বল্প সময়ের দেশে আসাকে কেন্দ্র করেই পুরোনো সদস্যদের একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ব্যান্ডটির সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার আনিসুজ্জামান আনিসের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্নভোজ ও আড্ডার।

সেই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন রেজওয়ান, বেজিস্ট বুলবুল, ড্রামার কোয়েল, গিটারিস্ট অপু, কিবোর্ডিস্ট পল্লব এবং সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার আনিসুজ্জামান আনিস। প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রমিথিউসের পথচলার কোনো না কোনো অধ্যায়। তাঁদের একসঙ্গে বসার মধ্য দিয়ে ফিরে আসে ব্যান্ডটির শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি, সৃষ্টির নেপথ্যের গল্প আর সংগীতকে ঘিরে কাটানো জীবনের মূল্যবান সময়।

কোনো আনুষ্ঠানিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে নয়, বরং খাবার টেবিল ঘিরে চলা সহজ-স্বাভাবিক কথোপকথনেই যেন প্রাণ ফিরে পায় পুরোনো দিনগুলো। স্মৃতির দরজা খুলে গেলে সময়ের ব্যবধান অনেকটাই মুছে যায়। পরিচিত মুখ, চেনা হাসি আর পুরোনো অভিজ্ঞতার গল্পে আড্ডা হয়ে ওঠে আবেগঘন।

১৯৮৬ থেকে চার দশকের সংগীতযাত্রা

১৯৮৬ সালে যাত্রা শুরু করা প্রমিথিউস বাংলা রক ও পপ সংগীতের বিকাশে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। দীর্ঘ চার দশকের পথচলায় ব্যান্ডটি প্রকাশ করেছে প্রায় ২০টি অ্যালবাম। সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন, শ্রোতার রুচি ও প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে; বদলেছে গান শোনা ও প্রকাশের মাধ্যমও। কিন্তু প্রমিথিউসের গান ঘিরে শ্রোতাদের স্মৃতি এবং ব্যান্ডটির নিজস্ব পরিচয় রয়ে গেছে স্বতন্ত্র।

‘মিলনের রক্ত’, ‘নির্জন শালবনে’, ‘স্বাধীনতা চাই’, ‘মুক্তির প্রত্যাশায়’, ‘প্রজন্মের সংগ্রাম’, ‘যোদ্ধা’ ও ‘স্মৃতির কপাট’—গানগুলোর নাম উচ্চারণ করলেই অনেক শ্রোতার মনে ভেসে উঠতে পারে জীবনের কোনো বিশেষ সময়, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস কিংবা ফেলে আসা দিনের অনুভূতি।

একটি ব্যান্ডের ইতিহাস কেবল অ্যালবামের সংখ্যা কিংবা জনপ্রিয় গানের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শিল্পীদের শ্রম, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সৃষ্টির আনন্দ, মতপার্থক্য সামলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। প্রমিথিউসের চার দশকের যাত্রাও তেমন অসংখ্য মুহূর্তের সমষ্টি। বনানীর আড্ডায় সেই পথচলার নানা স্মৃতি আবারও আলোচনায় আসে।

স্মৃতির আড্ডায় অনুপস্থিতিরও আলাদা ভাষা

পুনর্মিলনীতে উপস্থিত সদস্যদের আনন্দের পাশাপাশি ছিল দুজন গুরুত্বপূর্ণ সহশিল্পীর অনুপস্থিতি। দেশের বাইরে অবস্থান ও সময়ের ব্যবধানের কারণে অনলাইনে যুক্ত হতে পারেননি ব্যান্ডের প্রধান ভোকালিস্ট বিপ্লব এবং প্রতিষ্ঠাতা ও লিড গিটারিস্ট আরিফ।

তাঁরা উপস্থিত না থাকলেও আলোচনায় উঠে আসে তাঁদের কথা, তাঁদের অবদান এবং ব্যান্ডটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে সংগীতচর্চা করা মানুষদের সম্পর্কের গভীরতা বোধ হয় এমনই—শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও স্মৃতির আলোচনায় তাঁদের জায়গা অটুট থাকে।

একটি ব্যান্ডের পরিচয় গড়ে ওঠে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। কেউ কণ্ঠে গানকে প্রাণ দেন, কেউ গিটারের সুরে তৈরি করেন আবহ, কেউ তাল ধরে রাখেন ড্রামসে, কেউ বেজ বা কিবোর্ডে যোগ করেন নিজস্ব মাত্রা। এর বাইরে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মানুষদের অবদানও সংগীত নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রমিথিউসের পুনর্মিলনী সেই সম্মিলিত যাত্রার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

বদলে গেছে সময়, বদলায়নি বন্ধনের উষ্ণতা

জীবনের নিয়মেই সময়ের সঙ্গে মানুষের পথ আলাদা হয়ে যায়। কেউ থাকেন দেশে, কেউ পাড়ি জমান বিদেশে। পেশাগত ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত জীবন এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে নিয়মিত দেখা করাও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রমিথিউসের সাবেক সদস্যদের জীবনেও এসেছে এমন পরিবর্তন।

তবু একসময় একসঙ্গে গান করা, মহড়ায় সময় কাটানো কিংবা স্টুডিওতে নতুন সৃষ্টির অপেক্ষায় থাকার অভিজ্ঞতা তাঁদের পরস্পরের সঙ্গে অদৃশ্য এক বন্ধনে বেঁধে রেখেছে। সেই বন্ধনকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বনানীর এই অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলা।

এ ধরনের পুনর্মিলনীর বিশেষত্ব এখানেই—এখানে কে কতটা জনপ্রিয়, কার অর্জন কত বড়, কিংবা কে এখন কোথায় আছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একসঙ্গে কাটানো সময়। পুরোনো দিনের একটি ঘটনা, পরিচিত কোনো সুর কিংবা অতীতের ছোট্ট কোনো স্মৃতি মুহূর্তেই ফিরিয়ে আনতে পারে বহু বছর আগের অনুভূতি।

গান শেষ হয়, স্মৃতি নয়

প্রমিথিউসের এই পুনর্মিলনী ছিল না কোনো নতুন অ্যালবাম প্রকাশের অনুষ্ঠান কিংবা বড় মঞ্চের সংগীত আয়োজন। তবু এর গুরুত্ব কম নয়। কারণ, একটি ব্যান্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের পেছনে থাকা মানুষগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

চার দশকের পথচলায় প্রমিথিউস রেখে গেছে গান, স্মৃতি ও নিজস্ব সংগীতপরিচয়। আর সদস্যদের মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব সেই যাত্রাকে দিয়েছে মানবিক মাত্রা। বনানীর আর্টিস্ট ক্লাবের আড্ডা তাই কেবল কয়েকজন সাবেক সদস্যের একত্র হওয়া নয়; এটি ছিল নিজেদের অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া, পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে ছুঁয়ে দেখা এবং সংগীতের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনাড়ম্বর উপলক্ষ।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে যায়। বদলে যায় ঠিকানা, জীবনের ব্যস্ততা, মানুষের চলার পথ। কিন্তু কোনো গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি কিংবা একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার দিনগুলো সহজে মুছে যায় না। প্রমিথিউসের সদস্যদের এই মিলনমেলা যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রতিচ্ছবি—গানের সুর থেমে যেতে পারে, মঞ্চের আলো নিভে যেতে পারে, কিন্তু সংগীতের বন্ধন থেকে যায়।

চার দশক পরও তাই প্রমিথিউসের গল্প শুধু গানের গল্প নয়; এটি বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকা এক সম্পর্কের গল্প।