০৮:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের শুল্কবৃদ্ধি, রপ্তানিতে নতুন চাপ

The gallery was not found!

প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার শুল্ক, তালিকাভুক্ত ৩৬ প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন হার; ভারতে বাজার সংকোচনের শঙ্কা

বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্য, বিশেষ করে পাটের সুতা ও টুইনের ওপর প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে নির্ধারিত শুল্কের হার সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এক নয়; তালিকাভুক্ত উৎপাদকদের ক্ষেত্রে পণ্য ও প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হার প্রযোজ্য হবে।

ভারতের বাণিজ্য প্রতিকারবিষয়ক অধিদপ্তর ডিজিটিআরের মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে সংস্থাটি অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ভারতীয় বাজারে পাটপণ্য ডাম্পিং করছেন, যা দেশটির স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভারতের ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন ও এপি মেস্তা টুইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের পর গত বছরের জুনে পর্যালোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর বিদ্যমান অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বাড়ানো প্রয়োজন কি না, তা খতিয়ে দেখাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এ জন্য বাংলাদেশে ৫৪টি এবং নেপালে ৩৬টি মিলের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের ৩৮টি ও নেপালের পাঁচটি মিল তথ্য দেয়।

এর আগে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা বা টুইন, হেসিয়ান কাপড় এবং পাটের বস্তার ওপর প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল ভারত। পরে বাংলাদেশের পাটের বস্তার কাপড়ও এর আওতায় আসে। এতে দেশটিতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি কমে যায়।

গত ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশের ৩৬টি পাটপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কের পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাটের সুতা, বস্তা ও হেসিয়ান কাপড়ে প্রতি টনে ৫৯ ডলার থেকে বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৫৯ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠানের পাটের বস্তার ওপর প্রতি টনে ১২০ ডলার শুল্ক দিতে হবে।

ছয়টি প্রতিষ্ঠান—এএম জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, বোনানজা জুট কম্পোজিট, লাভলী জুট মিলস, নওহাটা জুট মিলস, পোদ্দার অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ—তাদের রপ্তানি করা সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে। এ ছাড়া নাটোর জুট মিলস ও জনতা জুট মিলস পাটের বস্তা ও হেসিয়ান কাপড় রপ্তানিতে এ সুবিধা পেয়েছে।

তবে তালিকার বাইরের কোনো উৎপাদক পাটের সুতা বা টুইন রপ্তানি করলে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার শুল্ক দিতে হবে। ফলে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় তালিকার বাইরের রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্কের বোঝা অনেক বেশি হতে পারে।

ডিজিটিআরের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত চলাকালে ভারতে পাটপণ্যের চাহিদা ২০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ। সংস্থাটির যুক্তি, স্থানীয় চাহিদা কমার তুলনায় আমদানি কমেছে কম হারে, ফলে ভারতীয় মিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিদেশি উৎপাদকেরা বাজারে নিজেদের অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছেন।

তবে বাংলাদেশের পাটশিল্পের প্রতিনিধিরা শুল্ক আরোপের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক নতুন শুল্ককে ‘একতরফা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা যে পরিমাণ ভর্তুকি পান বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, বাস্তবে তা তেমন নয়। বর্তমানে সরকার পাটের সুতা বা টুইন এবং পাটের বস্তার ওপর ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয় বলে জানান তিনি।

রপ্তানি পরিসংখ্যানেও খাতটির উত্থান-পতনের চিত্র স্পষ্ট। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ১১৬ কোটি ডলার আয় করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।

ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি ইতিমধ্যে কমেছে। নতুন শুল্কের ফলে বাজারটিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা, রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো এবং উৎপাদনকারীদের মুনাফা বজায় রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক আঁশভিত্তিক পণ্যের অন্যান্য বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন ক্রেতা খোঁজার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ১৯ নভেম্বর

Business Times24

বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের শুল্কবৃদ্ধি, রপ্তানিতে নতুন চাপ

Update Time : ১০:১৬:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার শুল্ক, তালিকাভুক্ত ৩৬ প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন হার; ভারতে বাজার সংকোচনের শঙ্কা

বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্য, বিশেষ করে পাটের সুতা ও টুইনের ওপর প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে নির্ধারিত শুল্কের হার সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এক নয়; তালিকাভুক্ত উৎপাদকদের ক্ষেত্রে পণ্য ও প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হার প্রযোজ্য হবে।

ভারতের বাণিজ্য প্রতিকারবিষয়ক অধিদপ্তর ডিজিটিআরের মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে সংস্থাটি অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ভারতীয় বাজারে পাটপণ্য ডাম্পিং করছেন, যা দেশটির স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভারতের ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন ও এপি মেস্তা টুইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের পর গত বছরের জুনে পর্যালোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর বিদ্যমান অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বাড়ানো প্রয়োজন কি না, তা খতিয়ে দেখাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এ জন্য বাংলাদেশে ৫৪টি এবং নেপালে ৩৬টি মিলের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের ৩৮টি ও নেপালের পাঁচটি মিল তথ্য দেয়।

এর আগে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা বা টুইন, হেসিয়ান কাপড় এবং পাটের বস্তার ওপর প্রতি টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল ভারত। পরে বাংলাদেশের পাটের বস্তার কাপড়ও এর আওতায় আসে। এতে দেশটিতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি কমে যায়।

গত ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশের ৩৬টি পাটপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কের পৃথক হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাটের সুতা, বস্তা ও হেসিয়ান কাপড়ে প্রতি টনে ৫৯ ডলার থেকে বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৫৯ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠানের পাটের বস্তার ওপর প্রতি টনে ১২০ ডলার শুল্ক দিতে হবে।

ছয়টি প্রতিষ্ঠান—এএম জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, বোনানজা জুট কম্পোজিট, লাভলী জুট মিলস, নওহাটা জুট মিলস, পোদ্দার অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ—তাদের রপ্তানি করা সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে। এ ছাড়া নাটোর জুট মিলস ও জনতা জুট মিলস পাটের বস্তা ও হেসিয়ান কাপড় রপ্তানিতে এ সুবিধা পেয়েছে।

তবে তালিকার বাইরের কোনো উৎপাদক পাটের সুতা বা টুইন রপ্তানি করলে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার শুল্ক দিতে হবে। ফলে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় তালিকার বাইরের রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্কের বোঝা অনেক বেশি হতে পারে।

ডিজিটিআরের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত চলাকালে ভারতে পাটপণ্যের চাহিদা ২০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ। সংস্থাটির যুক্তি, স্থানীয় চাহিদা কমার তুলনায় আমদানি কমেছে কম হারে, ফলে ভারতীয় মিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিদেশি উৎপাদকেরা বাজারে নিজেদের অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছেন।

তবে বাংলাদেশের পাটশিল্পের প্রতিনিধিরা শুল্ক আরোপের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক নতুন শুল্ককে ‘একতরফা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা যে পরিমাণ ভর্তুকি পান বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, বাস্তবে তা তেমন নয়। বর্তমানে সরকার পাটের সুতা বা টুইন এবং পাটের বস্তার ওপর ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয় বলে জানান তিনি।

রপ্তানি পরিসংখ্যানেও খাতটির উত্থান-পতনের চিত্র স্পষ্ট। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ১১৬ কোটি ডলার আয় করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।

ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি ইতিমধ্যে কমেছে। নতুন শুল্কের ফলে বাজারটিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা, রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো এবং উৎপাদনকারীদের মুনাফা বজায় রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক আঁশভিত্তিক পণ্যের অন্যান্য বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন ক্রেতা খোঁজার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।