টানা তিন মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি কমছিল। সংখ্যার হিসাবে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিতও মিলছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হওয়ার আগেই সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানীর বাজারে সবজি, চাল, আটা-ময়দা, তেল, ডিম ও দুধসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সেই বাড়তি খরচ কাঁচাপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের এই চাপ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাম্প্রতিক সময়ে কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমেছে।
এর আগে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। মে মাসে এ হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ এবং ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর পর নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে সরাসরি পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এর সঙ্গে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহের খরচও বাড়ে। ফলে কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অবশ্য বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বেগুনের দাম কোথাও কোথাও কেজিপ্রতি ১৬০ টাকায় উঠেছে। আগে ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া কয়েকটি সবজি এখন ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচমরিচের কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় উঠেছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা।
চালের বাজারেও দাম বেড়েছে। বিশেষ করে মাঝারি মানের চালের কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খোলা আটা ও ময়দার দাম কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়েছে।
খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। একই সঙ্গে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।
ডিমের বাজারেও চাপ রয়েছে। ফার্মের বাদামি ডিমের ডজন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও চারটি ডিমের দাম ৫৫ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
তরল দুধের দামও লিটারপ্রতি ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি। বর্তমানে এক লিটার দুধ ১১০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা পাম ও পাম সুপার তেল, বোতলজাত সয়াবিন তেল, খোলা আটা-ময়দা, মাঝারি মানের চাল, বড় দানার মসুর ডাল, বেগুন, কাঁচমরিচ ও ডিমের দাম বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। বিশেষ করে কাঁচাপণ্য পরিবহনে এই বাড়তি ব্যয় দ্রুত খুচরা মূল্যে যুক্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সরাসরি ব্যয়ের মধ্যে সীমিত থাকে না। এটি বাজারে একটি অজুহাত হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তিনি বলেন, দিনের পর দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আগে থেকেই চাপ রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের কৌশল নেওয়া হবে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একটি ‘ছোঁয়াচে’ প্রভাব তৈরি করতে পারে। পরিবহন বা উৎপাদন খরচ যতটা বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি হারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই বাজারে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।
উচ্চ বাজারদরের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
বাসাবো এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় মাসিক বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল, তেল ও মসলা কিনতেই আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। মাছ-মাংসের পরিমাণ আগেই কমিয়েছেন, এখন ডিম ও দুধও তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
কদমতলী এলাকার দিনমজুর মোতাহার মিয়া বলেন, দাম বাড়তে থাকায় একের পর এক খাবার তালিকা থেকে বাদ দিতে হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই আয় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে আগে থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন একটি অজুহাত তৈরি করেছে।
তার মতে, বাজার তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে। বিচ্ছিন্ন অভিযান বা জরিমানা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল অর্থনীতি এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে এক ধাক্কায় জ্বালানির দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
তার মতে, সরকার চাইলে জ্বালানি আমদানির ওপর কর সাময়িকভাবে কমানো, অপচয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ব্যয় সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা সীমিত রাখতে পারত।
তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। তাই পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা জরুরি।
ড. জাহিদ হোসেনও মনে করেন, নতুন করে বড় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়ার আর্থিক সুযোগ সীমিত হলেও বিদ্যমান কর্মসূচি ও বরাদ্দ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার পর জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি এখন নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাজারে এর প্রভাব কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বাজার তদারকির ওপর। তবে আপাতত নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন সেই মানুষগুলোই, যাদের মাসিক আয় বাড়েনি, কিন্তু খরচ বাড়ছে প্রায় প্রতিদিন।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















