শিঙাড়া কিনলেন, বিক্রেতা সুন্দর করে একটা খবরের কাগজে মুড়ে দিলেন। কী চমৎকার! এক প্যাকেটে নাশতা, সঙ্গে দেশের-দুনিয়ার খবর। পড়তে পড়তে খেতে পারবেন। শুধু একটা জিনিসের অভাব—খবরের কাগজে লেখা নেই, এই প্যাকেটের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিটা কত টাকা দামের!
আমাদের শহরের ফুটপাত যেন খাবার পরিবেশনের নিজস্ব গবেষণাগার। শসা-আমড়া থেকে ঝালমুড়ি, ছোলা থেকে পিঁয়াজু, বেগুনি থেকে শিঙাড়া—সবকিছুরই শেষ ঠিকানা কাগজের ঠোঙা। কাগজ না থাকলে খাবার যেন খাবারই নয়!
কাগজটা যদি খবরের কাগজ হয়, তো কথাই নেই। সকালে যে পাতায় রাজনীতি, অর্থনীতি আর আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে খবর ছাপা হয়েছে, দুপুরে সেই পাতাই হয়ে গেল শিঙাড়ার বিছানা। দেশের সংকটের সঙ্গে এবার পেটের সংকটও একই পাতায়!
এক ঠোঙায় নাশতা, খবর আর কালি
সমস্যাটা কাগজে নয়, সমস্যা হলো কোন কাগজে কী রাখা হচ্ছে—এখানে।
খাবারের জন্য তৈরি নয় এমন কাগজের কালি, কাগজের অন্যান্য উপাদান কিংবা জীবাণু খাবারের সংস্পর্শে আসতে পারে। বিশেষ করে গরম, তেলযুক্ত বা ভেজা খাবার কাগজে রাখলে এই ঝুঁকির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, শিঙাড়ার তেল যখন কাগজে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটাকে শুধু ‘তেল ঝরা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তেল ও আর্দ্রতা কাগজের কিছু উপাদান খাবারে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিক্রেতার কাছে কাগজ, ক্রেতার কাছে কপাল
বিক্রেতার যুক্তিও সহজ—কাগজ সস্তা, সহজলভ্য, কাজের কাজও হয়। ক্রেতার যুক্তি আরও সহজ—‘ভাই, একটা শিঙাড়া দেন।’
এর মধ্যে স্বাস্থ্য কোথায়?
সেটা হয়তো ঠোঙার ভাঁজের মধ্যেই কোথাও চাপা পড়ে থাকে।
বিশেষ করে পুরোনো বা অপরিষ্কার কাগজে খাবার রাখলে কাগজের মাধ্যমে জীবাণু খাবারে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে খাবারের স্বাদ যতই মুখরোচক হোক, পরিবেশনের পদ্ধতিটা স্বাস্থ্যকর না হলে বিপদটা অন্য জায়গায়।
খবরের কাগজেরও তো আত্মসম্মান আছে!
খবরের কাগজের কাজ খবর দেওয়া। তাকে দিয়ে শিঙাড়ার তেল শোষানো, জিলাপির সিরা সামলানো কিংবা ঝালমুড়ির ঠোঙা বানানো—এটা কাগজটির জন্যও এক ধরনের পেশাগত পরিবর্তন!
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আমরা খবরের কাগজে ছাপা রাসায়নিক নিয়ে চিন্তা করি না, কিন্তু খবরের কাগজে ছাপা খবর নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক করি। রাজনীতির খবর নিয়ে বিতর্ক করতে করতে সেই একই পাতার ওপর রাখা পুরিটা নিশ্চিন্তে খেয়ে ফেলি।
স্বাস্থ্যঝুঁকির খবরটা অবশ্য তখন আর পড়া হয় না।
‘ফুড-গ্রেড’ শব্দটা শুধু বড় দোকানের জন্য নয়
খাবার নিরাপদ রাখতে খুব বড় কোনো আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই। খাবারের সংস্পর্শে ব্যবহারের উপযোগী কাগজ বা প্যাকেজিং ব্যবহার করলেই ঝুঁকি কমানো যায়।
চিকিৎসকদের পরামর্শও মূলত সেদিকেই—খবরের কাগজ, হাতে লেখা কাগজ বা সাধারণ প্রিন্টিং কাগজে সরাসরি খাবার না রাখা।
টিস্যু বা পেপার টাওয়েল ব্যবহার করলেও সেটি খাবারের সংস্পর্শের জন্য উপযুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
শেষ কথা: শিঙাড়া খাবেন, কাগজ নয়
আমাদের খাবারের সংস্কৃতিতে ঠোঙার ভূমিকা ছোট নয়। কিন্তু ঠোঙা যেন খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু ‘উপহার’ না দেয়।
দোকানদার একটু সচেতন হোন, ক্রেতাও একটু চোখ খোলা রাখুন। কারণ ১০ টাকার শিঙাড়ার সঙ্গে ১০০ টাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি কেন কিনব?
খবরের কাগজে খবর থাকুক, শিঙাড়া থাকুক প্লেটে।
দুটোকে আলাদা রাখলেই বরং দুজনেরই মানসম্মান থাকে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















