০৭:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্য দাম মিলছে না পোলট্রি খামারিদের

The gallery was not found!

ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও উৎপাদিত মুরগি ও ডিমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার পোলট্রি খামারিরা লোকসানে পড়েছেন। বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকায় ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের একটি অংশ উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খামারিদের একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পোলট্রি উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যায় ফিডে। আর সেই ফিডের প্রধান কাঁচামালের দাম সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত এক মাসে ভুট্টার দাম কেজিপ্রতি ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে। ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যানের দাম ২৬ থেকে ৩৩ টাকা, রাইস ব্র্যান অয়েল ৩৩ থেকে ৩৯ টাকা এবং সয়াবিন মিল ৫৮ থেকে ৬৬ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দামও বেড়েছে।

ফিডের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে খামার পর্যায়ে। গত সপ্তাহেও বিভিন্ন ধরনের পোলট্রি ফিডের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে।

জেলায় জেলায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির খামারি মোমিনুল ইসলাম আগে মাসে প্রায় ৭০ বস্তা ফিড কিনতেন। দাম বাড়ার পর এখন ৬০ বস্তা কিনছেন। এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন হচ্ছে না, আবার বাজারেও প্রত্যাশিত দাম মিলছে না।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। সেখানে শতাধিক প্রান্তিক খামারি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় এবং ডিম-মুরগির ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মানববন্ধন করেছেন। স্থানীয় খামারিদের কেউ কেউ লোকসানের কারণে খামার বন্ধের পথে রয়েছেন।

চাঁদপুরের মতলব উত্তরেও ফিড, ওষুধ ও লেয়ার বাচ্চার দাম বাড়ায় খামারিদের ব্যয় বেড়েছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে ডিমের বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় কয়েকটি খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গাজীপুরের শ্রীপুরে ফিডের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রান্তিক খামারিরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ পর্যন্ত করেছেন। তাদের দাবি ছিল ফিডের দাম কমানো এবং উৎপাদন উপকরণের বাজারে কার্যকর নজরদারি।

নোয়াখালীর কবিরহাটের খামারি মাজেদুল হকের অভিজ্ঞতাও একই প্রবণতার উদাহরণ। তার খামারে ফিড ও ওষুধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৪০ টাকায় বিক্রি করলেও সম্প্রতি ১৩২ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে চলতি ব্যাচ বিক্রির পর খামার বন্ধ করার কথা ভাবছেন তিনি।

খামারি ও ভোক্তার দামে ব্যবধান

শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়াই নয়, খামারি ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের ব্যবধানও পোলট্রি খাতের অন্যতম সমস্যা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক বাপন দে বলেন, অনেক সময় ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার প্রায় ১৮০ টাকা হলেও খামারিরা পান ১৩৫-১৪০ টাকা। বিপণন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের কারণে এ ব্যবধান তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

এ অবস্থায় নিয়মিত বাজার তদারকি, মূল্যতালিকা প্রকাশ এবং খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

কাঁচামাল ও নীতিসহায়তার দাবি

ফিড শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামালের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর। ফলে আমদানি ব্যয় বাড়লে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এফআইএবি) কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট, কর ও শুল্ক পুনর্বিবেচনা, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছে।

খামারিরাও ফিড, বাচ্চা ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত না হলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হবে।

পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন উপকরণের বাজার, ফিডের কাঁচামাল এবং খামারি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থা—এই তিন জায়গায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে প্রান্তিক খামারির সংখ্যা কমে গিয়ে ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ১৯ নভেম্বর

Business Times24

উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্য দাম মিলছে না পোলট্রি খামারিদের

Update Time : ০৫:৪৭:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও উৎপাদিত মুরগি ও ডিমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার পোলট্রি খামারিরা লোকসানে পড়েছেন। বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকায় ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের একটি অংশ উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খামারিদের একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পোলট্রি উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যায় ফিডে। আর সেই ফিডের প্রধান কাঁচামালের দাম সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত এক মাসে ভুট্টার দাম কেজিপ্রতি ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে। ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যানের দাম ২৬ থেকে ৩৩ টাকা, রাইস ব্র্যান অয়েল ৩৩ থেকে ৩৯ টাকা এবং সয়াবিন মিল ৫৮ থেকে ৬৬ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দামও বেড়েছে।

ফিডের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে খামার পর্যায়ে। গত সপ্তাহেও বিভিন্ন ধরনের পোলট্রি ফিডের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে।

জেলায় জেলায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির খামারি মোমিনুল ইসলাম আগে মাসে প্রায় ৭০ বস্তা ফিড কিনতেন। দাম বাড়ার পর এখন ৬০ বস্তা কিনছেন। এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন হচ্ছে না, আবার বাজারেও প্রত্যাশিত দাম মিলছে না।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। সেখানে শতাধিক প্রান্তিক খামারি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় এবং ডিম-মুরগির ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মানববন্ধন করেছেন। স্থানীয় খামারিদের কেউ কেউ লোকসানের কারণে খামার বন্ধের পথে রয়েছেন।

চাঁদপুরের মতলব উত্তরেও ফিড, ওষুধ ও লেয়ার বাচ্চার দাম বাড়ায় খামারিদের ব্যয় বেড়েছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে ডিমের বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় কয়েকটি খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গাজীপুরের শ্রীপুরে ফিডের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রান্তিক খামারিরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ পর্যন্ত করেছেন। তাদের দাবি ছিল ফিডের দাম কমানো এবং উৎপাদন উপকরণের বাজারে কার্যকর নজরদারি।

নোয়াখালীর কবিরহাটের খামারি মাজেদুল হকের অভিজ্ঞতাও একই প্রবণতার উদাহরণ। তার খামারে ফিড ও ওষুধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৪০ টাকায় বিক্রি করলেও সম্প্রতি ১৩২ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে চলতি ব্যাচ বিক্রির পর খামার বন্ধ করার কথা ভাবছেন তিনি।

খামারি ও ভোক্তার দামে ব্যবধান

শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়াই নয়, খামারি ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের ব্যবধানও পোলট্রি খাতের অন্যতম সমস্যা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক বাপন দে বলেন, অনেক সময় ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার প্রায় ১৮০ টাকা হলেও খামারিরা পান ১৩৫-১৪০ টাকা। বিপণন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের কারণে এ ব্যবধান তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

এ অবস্থায় নিয়মিত বাজার তদারকি, মূল্যতালিকা প্রকাশ এবং খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

কাঁচামাল ও নীতিসহায়তার দাবি

ফিড শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামালের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর। ফলে আমদানি ব্যয় বাড়লে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এফআইএবি) কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট, কর ও শুল্ক পুনর্বিবেচনা, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছে।

খামারিরাও ফিড, বাচ্চা ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত না হলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হবে।

পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন উপকরণের বাজার, ফিডের কাঁচামাল এবং খামারি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থা—এই তিন জায়গায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে প্রান্তিক খামারির সংখ্যা কমে গিয়ে ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।