০৪:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দাতাদের চোখ বাংলাদেশে: অর্থের সঙ্গে সংস্কারের চাপ, ঋণের কঠিন পরীক্ষা

The gallery was not found!

আন্তর্জাতিক দাতা ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির দেশ। বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাত সংস্কারে অর্থ দিচ্ছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাড়াচ্ছে ঋণ, জাপান সহায়তা করছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। আর নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলছে আলোচনা। তবে অর্থের প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারের চাপও জোরালো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাজার, বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু মোকাবিলায় বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। বিপরীতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

২০২৩ সালে শুরু হওয়া আইএমএফের পুরোনো কর্মসূচির চেয়ে এখন নতুন অর্থায়ন কর্মসূচিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জুনে বাংলাদেশ নতুন কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের একটি দল ঢাকায় এসে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সংস্কারের অগ্রাধিকার পর্যালোচনা করে। সংস্থাটির বিবেচনায় নতুন কর্মসূচিতে ব্যাংক খাত ও দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক গত ২৪ জুন ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। আমানত সুরক্ষা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারে এই অর্থ ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে।

এডিবিও বাংলাদেশে অর্থায়ন বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছে। মাঝারি মেয়াদে বার্ষিক সার্বভৌম ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রায় ২ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগে ৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যাংক খাত সংস্কারেও এডিবির অর্থ যাচ্ছে।

জাপানের জাইকা জুনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহে সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ঋণ চুক্তি করেছে। অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের সঙ্গে এখন নীতিগত সংস্কারও সরাসরি যুক্ত হচ্ছে।

তবে বড় প্রশ্ন ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে, জুলাইয়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করেছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে পরিশোধ হয়েছে ২ দশমিক ০৪৭৬ বিলিয়ন ডলার।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে।

আইএমএফ সতর্ক করেছে, রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে কার্যকর সংস্কার না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। মাঝারি মেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচেও নামার ঝুঁকি রয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, শুধু নতুন ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ নেই। রাজস্ব বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানও মনে করেন, নতুন ঋণের অঙ্কের চেয়ে সেই ঋণ দিয়ে অর্থনীতি কতটা আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা তৈরি করতে পারছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন বড়, পরীক্ষাও তেমন কঠিন। দাতাদের অর্থায়নকে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ব্যাংক, রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের কাঠামোগত সংস্কার করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

Business Times24

দাতাদের চোখ বাংলাদেশে: অর্থের সঙ্গে সংস্কারের চাপ, ঋণের কঠিন পরীক্ষা

Update Time : ১০:৪৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক দাতা ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির দেশ। বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাত সংস্কারে অর্থ দিচ্ছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাড়াচ্ছে ঋণ, জাপান সহায়তা করছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। আর নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলছে আলোচনা। তবে অর্থের প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারের চাপও জোরালো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাজার, বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু মোকাবিলায় বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। বিপরীতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

২০২৩ সালে শুরু হওয়া আইএমএফের পুরোনো কর্মসূচির চেয়ে এখন নতুন অর্থায়ন কর্মসূচিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জুনে বাংলাদেশ নতুন কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের একটি দল ঢাকায় এসে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সংস্কারের অগ্রাধিকার পর্যালোচনা করে। সংস্থাটির বিবেচনায় নতুন কর্মসূচিতে ব্যাংক খাত ও দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক গত ২৪ জুন ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। আমানত সুরক্ষা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারে এই অর্থ ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে।

এডিবিও বাংলাদেশে অর্থায়ন বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছে। মাঝারি মেয়াদে বার্ষিক সার্বভৌম ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রায় ২ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগে ৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যাংক খাত সংস্কারেও এডিবির অর্থ যাচ্ছে।

জাপানের জাইকা জুনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহে সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ঋণ চুক্তি করেছে। অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের সঙ্গে এখন নীতিগত সংস্কারও সরাসরি যুক্ত হচ্ছে।

তবে বড় প্রশ্ন ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে, জুলাইয়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করেছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে পরিশোধ হয়েছে ২ দশমিক ০৪৭৬ বিলিয়ন ডলার।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে।

আইএমএফ সতর্ক করেছে, রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে কার্যকর সংস্কার না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। মাঝারি মেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচেও নামার ঝুঁকি রয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, শুধু নতুন ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ নেই। রাজস্ব বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানও মনে করেন, নতুন ঋণের অঙ্কের চেয়ে সেই ঋণ দিয়ে অর্থনীতি কতটা আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা তৈরি করতে পারছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন বড়, পরীক্ষাও তেমন কঠিন। দাতাদের অর্থায়নকে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ব্যাংক, রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের কাঠামোগত সংস্কার করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।